পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা

হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থির মধ্যে থাইরয়েড একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। ইহা গলার সম্মুখভাগে ত্বক ও মাংসের গভীরে অবস্থান করলেও এ গ্রন্থিটির আকার বড় হলে গলগণ্ড নামক রোগ হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ঘ্যাগও বলা হয়ে থাকে। এই গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোন শরীরের সমস্ত বিপাক প্রক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব অপরিসীম। থাইরয়েড জনিত রোগীর সংখ্যাও অনেক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের দেশেও থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে।

 

গত শতকের আশির দশকেও থাইরয়েডের চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সার্বজনীন ছিল না। চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা ও পুরনো কয়েকটি টেস্টের মাধ্যমেই থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হতো । এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা বিলম্বিত ও ত্রুটিপূর্ণ হবার আশংকা থাকতো। আধুনিক পদ্ধতিতে থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন নির্ণয়ের প্রচলন ক্রমান্বয়ে আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। থাইরয়েডের রোগের ধরণও তখন ভিন্ন ছিল।  আয়োডিনের অভাবজনিত থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ গলগণ্ড ও এর জটিলতার সংখ্যা এত বেশী ছিল যে এই গ্রন্থির অন্যান্য রোগ যেমন গ্রেভস ডিজিস, হাশিমোটো ডিজিস,  হাইপো ও হাইপার থাইরয়েড রোগসমূহ, থাইরয়েডের ক্যান্সার জাতীয় রোগ ইত্যাদির আনুপাতিক হার তুলনামূলক ভাবে কম মনে হতো। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায় যে  ঐ সময়ে আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে আয়োডিনের অভাবজনিত গলগণ্ড রোগের প্রকোপ ছিল প্রায় শতকরা পয়ত্রিশজনের কাছাকাছি। এসব রোগের সঠিক পরিসংখ্যান  বিজ্ঞানসম্মত জার্নালে প্রকাশিত ছিল না বলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  আমাদের দেশের পরিসংখ্যান ছিল অনেকটাই অনুমান নির্ভর। জন বি ষ্টানবারী নামক এক বিশেষজ্ঞ আয়োডিন জনিত রোগ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ১৯৮১ সালেও বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগের সঠিক কোন পরিসংখ্যান বা রিপোর্ট না পাবার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৯৫ সালে তদানীন্তন পিজি হাসপাতালে আমি ও আমার প্রবীণ সহকর্মীদের করা এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায় যে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা সকল থাইরয়েড রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশী, প্রায় ৩৫%। পত্রিকান্তরে ১৯৬৬ সালে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় প্রায় এক চতুর্থাংশ লোকের গলগণ্ড রোগ ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে। চিকিৎসক, গবেষক, স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারক ও সর্বস্তরের জনগণের অংশ গ্রহণে আয়োডিন যুক্ত লবণ গ্রহণ কার্যক্রম সার্বজনীনভাবে গৃহীত হবার ফলে গলগণ্ড রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত থাইরয়েডের রোগের চেয়ে অন্যান্য থাইরয়েড রোগের হারই বেশী। এদের মাঝে হাইপোথাইরয়েডিসম, থাইরটক্সিকসিস ও থাইরয়েডের ক্যান্সারজনিত রোগসমূহই প্রধান। উল্লেখ্য যে থাইরটক্সিকসিস জাতীয় রোগ হলে হরমোনের আধিক্যে রোগীর চঞ্চলতা বৃদ্ধিপায়, হাত পা কাপে, বুক ধড়পড় করে, যথেষ্ট খাওয়া সত্যেও ওজন কমে যায়, শরীর ঘামে ও ক্ষেত্র বিশেষে মানসিক সমস্যাসহ নানাবিধ জটিলতা দেখা দেয়। হাইপোথাইরয়েডিসমে প্রায় উল্টো রকম সমস্যা দেখা যায়। হরমোনের মাত্রা কমে যাবার কারণে রোগী অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, ওজন বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, শরীর ব্যথা করে, মাসিক অনিয়মিত হয়, সন্তান ধারণ ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি কমে যায়, চুল পড়ে যেতে থাকে এবং নানাবিধ মানসিক উপসর্গও দেখা দেয়।

 

আজকাল ল্যাবরেটরি মেডিসিন, রেডিওলোজী ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের উন্নতির ফলে আমাদের দেশেও থাইরয়েড রোগ বেশ আগেই সনাক্ত করা যায়। রোগের উপসর্গ দেখা দেবার আগেই শতকরা প্রায় দশভাগ লোকের রক্ত পরীক্ষায় থাইরয়েড হরমোনের মাত্রায় তারতম্য পাওয়া যায় যা এতকাল কারও জানার সুযোগ ছিল না। এসব রোগীকে সাব ক্লিনিক্যাল বা সুপ্ত থাইরয়েড জনিত রোগ বলা যেতে পারে। এসব রোগীদেরকেও চিকিৎসাসেবার  আওতায় রাখা প্রয়োজন যদিও অধিকাংশেরই কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। এসকল সুপ্ত রোগী  ও পরিপূর্ণ উপসর্গসহ থাইরয়েডের রোগী মিলিয়ে অনুমান করা যায় যে শতকরা দশ থেকে বিশ ভাগ লোকের কোন না কোন থাইরয়েডের রোগ আছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু রোগী থাইরয়েডাইটিস ও থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত ।

 

থাইরয়েড চিকিৎসায় ব্যাপক উন্নতির ফলে আজকাল পূর্বের ন্যায়  অতিমাত্রার হাইপো বা হাইপারথাইরয়েড রোগী কম দেখা যায়। অন্য কোন রোগ চিকিৎসার জন্য পরীক্ষা করার সময় অনেকের থাইরয়েড জনিত রোগ প্রথমবারের মত সনাক্ত হতে দেখা যায়। চিকিৎসা আপাতঃদৃষ্টিতে সহজ মনে হওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ  ছাড়াই অনেক রোগী  চিকিৎসা চালিয়ে যান  ফলে কখনও কখনও মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা আগের তুলনায় বেশী সহজ প্রাপ্য হবার কারণে অনেকেই টেস্টগুলো কারণে অকারণে করে থাকেন এবং অনেকেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই  শুধুমাত্র টেস্টের সামান্য তারতম্য দেখেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে থাইরয়েডের ওষুধ দিনের পর দিন সেবন করে যাচ্ছেন। ইহা অপ্রত্যাশিত এবং রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে রোগীরা হার্টের অসুখ ও অষ্টিওপরোসিস নামক অস্থি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে থাইরটক্সিক ক্রাইসিস নামক জটিলতায় আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুকি প্রায় শতভাগ। থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় প্রভূত উন্নতি হওয়া সত্যেও অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে প্রাণহানি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও যত্নবান হতে হবে। এই রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও চিকিত্সাপরবর্তী পরিচর্যায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত প্রায় সব বিভাগের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। এদের মাঝে ল্যাবরেটরি মেডিসিন, শল্য বিভাগ, ইএনটি ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রায়ই দরকার হয়। এ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় কখনও কখনও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গত কারণেই রেডিয়েশন ভীতি রয়েছে। অতিরিক্ত রেডিয়েশনের ফলে ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ আরও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া যাতে না হয় এজন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের প্রচেষ্টা রয়েছে আর চিকিৎসকরাও বিশেষভাবে প্রয়োজন না হলে নিউক্লিয়ার মেডিসিনে রোগীদেরকে অহেতুক রেডিয়েশনের ঝুঁকিতে রাখেন না। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল  চিকিৎসকদের কে কোন রোগের বিশেষজ্ঞ তা সার্টিফিকেট যাচাই করে নির্ধারণ করেন যা

 

সাধারণ জনগণ ভালভাবে অবহিত নন। এই সুযোগেই অপচিকিত্সার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যা থাইরয়েডের রোগের বেলায়ও দেখা যায়। কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত নয় এমন কারও চিকিৎসার মত স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রাকটিস করা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় অর্জন কম নয়। দেশের বড় বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে  এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগ চালু হয়েছে। থাইরয়েড রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় অনেক সময় নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। আণবিক শক্তি কমিশনের আওতায় বেশ কয়েকটি চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের শাখা রয়েছে যা ভবিষ্যতে আরও প্রসারিত হবে আশা করা যায়। সার্জারি ও অনকোলজী বিভাগের বিভিন্ন শাখার বিস্তার ভবিষ্যতে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এ রোগ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। চিকিৎসার টার্গেট নির্ধারণে ব্যাপকভাবে বিদেশী গাইডলাইন ব্যবহারের যে রেওয়াজ চালু আছে সেসব দেশীয় গবেষণা দ্বারা আমাদের দেশের জন্য উপযোগী করা প্রয়োজন। বিশেষকরে গর্ভবতী মহিলাদের থাইরয়েড রোগের  চিকিৎসা আমাদের দেশীয় তথ্যের ভিত্তিতে হওয়া খুবই প্রয়োজন। থাইরয়েডের রোগসমূহ  মূলত: অসংক্রামক। পরিবেশদুষণের সাথে এ সকল রোগের যোগসূত্র আছে কিনা সে বিষয়েও গবেষণা করা প্রয়োজন। থাইরয়েড একটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি বিধায় এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগের প্রসারের সঙ্গেই থাইরয়েড রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারিত হবে। দিন দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকারী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগের আরও প্রসার ঘটলে এবং রোগীরা সচেতনভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করলে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় বিদেশে যাবার প্রয়োজন শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
আপনার মুখে দুর্গন্ধ? লবঙ্গ দিয়ে মাত্র ১০ মিনিটে দূর করুন মুখের দুর্গন্ধজেনে নিন কিভাবে কিভাবে দূর করবেন আপনার মুখে দুর্গন্ধ
৩ টাকা দিয়ে ফলটি কিনুন !! এই একটি ফলের রসেই গলবে কিডনির পাথর।বিস্তারিত ভিতরে পড়ুন
ক্যানসার-তেজস্ক্রিয়তাও প্রতিরোধ করে সাদা তিল! রয়েছে আরও বহু উপকারিতাবিস্তারিত পড়ুন ক্যানসার-তেজস্ক্রিয়তাও প্রতিরোধ করে সাদা তিল! রয়েছে আরও বহু উপকারিতা
যে কারণে ক্রুসিফেরি পরিবারের সবজি খাওয়া ভালোবিস্তারিত পড়ুন যে কারণে ক্রুসিফেরি পরিবারের সবজি খাওয়া ভালো
খাওয়ার পর একটু হাঁটার সুফলবিস্তারিত পড়ুন খাওয়ার পর একটু হাঁটার সুফল
পর্যাপ্ত ফল ও সবজি না খেলে যা হয়বিস্তারিত পড়ুন পর্যাপ্ত ফল ও সবজি না খেলে যা হয়
যে সকল সুস্বাদু খাবার আপনার শরীরের মেদবৃদ্ধি করবে নাবিস্তারিত পড়ুন যে সকল সুস্বাদু খাবার আপনার শরীরের মেদবৃদ্ধি করবে না
এবার চিরকালের জন্য কোমরের ব্যথা দূর করার জাদুকরি উপায় জেনে রাখুনবিস্তারিত পড়ুন এবার চিরকালের জন্য কোমরের ব্যথা দূর করার জাদুকরি উপায় জেনে রাখুন
জিরা খেয়ে ১৫ দিনে মেদচর্বি একদম ঝরিয়ে ফেলুনজিরা খেয়ে ১৫ দিনে মেদচর্বি একদম ঝরিয়ে ফেলুন! জেনে নিন কখন, কি ভাবে খাবেন?
শিশুদেরকে বাহু ধরে ঘোরানো ঠিক নয়বিস্তারিত পড়ুন শিশুদেরকে বাহু ধরে ঘোরানো ঠিক নয়
আরও ১২৭৯ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি