পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন

ঈশ্বরবোধ ও মানবসেবার জন্যই স্বামীজী সমগ্র ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৯৯ সনের সূচনাতেই স্বামীজী তাঁর দুজন শিষ্য স্বামী বিরজানন্দ ও স্বামী প্রকাশনান্দকে বাংলাদেশ (তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ) প্রেরণ করেন প্রচারকরূপে।

 

অবস্থান ও ঠিকানা

ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব ও দৈনিক ইনকিলাবের সামনের রাস্তায় এর অবস্থান। ২৭, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা, বাংলাদেশ – ১২০৩। যোগাযোগের ফোন নম্বর ৯৫৫৩৭০৩ এবং ৯৫৬৪০৫৫। ওয়েবসাইট: www.rkmdhaka.org

 

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

জমিদার যোগেশ দাস তাঁর সাত হাজার টাকায় কেনা সাত বিঘা জমির উপরেই ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠিত করেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ইতিহাস গ্রন্থে দেখা যায় এই কেন্দ্র ১৯১৫ সালে ১.৭ একর জমি পেয়েছিল। এর কিছুদিন পরে একই বছরে পূর্বের থেকে আরও কিছু বেশী জমি ক্রয় করা হয়। যেখানে মঠ এবং মিশনের অট্রালিকা, সাধু নিবাস, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নির্মিত হয়।

 

খোলা বন্ধের সময়সূচী

প্রত্যহ সকাল ৮ টা হতে রাত ৯ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এছাড়া লাইব্রেরী – রবিবার ও মেডিকেল সেন্টার এবং স্কুল যথারীতি শুক্রবার বন্ধ থাকে। এছাড়া সমগ্র মিশন ও মঠ নির্দিষ্ট কোন সাপ্তাহিক বন্ধ নেই।

 

উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

“আত্মনো মোক্ষার্মং জগদ্বিতায় চ” অর্থাৎ নিজের মুক্তির সাথে সাথে জগতেরও কল্যাণ সাধন করা। প্রতি মানবে বা জীবে শ্রীভগবান বিরাজিত। জীবকে সেবা করাই হলো ভগবানের সাক্ষাৎ সেবা করা। এই বোধেই স্বামীজী উপলব্ধি করলেন।

“বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?

জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর”।।

এই ঈশ্বরবোধ মানবসেবার জন্যই স্বামীজী প্রতিষ্ঠা করলেন রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৯৭ সনের ১ মে। যার উদ্দেশ্য: মানবের হিতার্থ শ্রীরামকৃষ্ণ যে সকল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন এবং কার্যে তাঁর জীবনে প্রতিপাদিত হয়েছে তার প্রচার এবং মানুষের দৈহিক, মানসিক ও পারমার্থিক উন্নতিকল্পে যাতে সেই সকল তত্ত্ব প্রযুক্ত হতে পারে। তদ্বিষয়ে সাহায্য করা এই “প্রচারের” (মিশনের) উদ্দেশ্য।

 

ব্রত

জগতের যাবতীয় ধর্মমতকে এক অক্ষয় সনাতন ধর্মের রূপান্তরমাত্র জ্ঞানে সকল ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আত্মীয়তা স্থাপনের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ যে কার্যের অবতারণা করেছিলেন। তার পরিচালনাই এই “প্রচারের” মিশনের ব্রত।

কার্যপ্রণালী: মানুষের সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিদ্যাদানের উপযুক্ত লোক শিক্ষতকরণ, শিল্প ও শ্রমোপজীবিকার উৎসাহ বর্ধন এবং বেদান্ত ও অন্যান্য ধর্মভাব রামকৃষ্ণ জীবনে যেরূপে ব্যাখ্যাত হয়েছিল তা জনসমাজে প্রবর্তন।

 

ভারতবর্ষীয় কার্য

ভারতবর্ষের নগরে নগরে আচার্যব্রত গৃহনাভিলাষী গৃহস্থ বা সন্ন্যাসীদের শিক্ষার আশ্রয় স্থাপন এবং যাতে তাঁরা দেশ দেশান্তরে গিয়ে জনগণকে শিক্ষিত করতে পারেন তার উপায় অবলম্বন।

 

বিদেশীয় কার্যবিভাগ

ভারত বহির্ভুত দেশসমূহে “ব্রতচারী” প্রেরণ এবং সেসব দেশে স্থাপিত আশ্রম এর সাথে আশ্রমগুলোর ঘনিষ্ঠতা ও সহানুভূতি বর্ধন এবং নতুন নতুন আশ্রম সংস্থাপন। বলাবাহুল্য, রাজনীতির সাথে এর কোন সম্বন্ধ থাকবে না। মিশনের লক্ষ্য ও আদর্শ যেহেতু কেবল আধ্যাত্মিক ও সেবামূলক।

 

তৎকালীন প্রেক্ষাপটে রামকৃষ্ণ মিশন এর নিয়মাবলী

এই মিশন বেলুড় মিশনের শাখা বলে পরিগণিত হবে এবং “রামকৃষ্ণ মিশনের ঢাকাস্থ শাখা কেন্দ্র” বলে অভিহিত হবে। সুতরাং রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যান্য শাখা কেন্দ্রসমূহ পরিচালনার জন্য যে সমস্ত নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়েছে এই মিশনের নিয়মাবলীতেও তদনুসারি গঠিত হবে।

 

  • জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমূদয় চাঁদাদাতা সমস্ত নিয়মিত সেবক এবং যে কেউ মিশনের কার্যে নি:স্বার্থভাবে উপযুক্তরূপ সহায়তা করবেন তিনিই স্থানীয় কার্যনির্বাহক সমিতি কর্তৃক মনোনীত হলে সাধারন সভ্য শ্রেণীভুক্ত হতে পারবেন।
  • সভ্য পদপ্রার্থী মিশনের অন্তত দুজন পুরাতন সভাসদের অনুরোধে সমিতিতে দরখাস্ত করবেন। যথাকালে তাঁকে এই দরখাস্তের ফলাফল জানানো হবে।
  • প্রত্যেক সভ্যকে এক টাকা ভর্তির ফি এবং মাসিক অন্তত আট আনা জমা দিতে হবে। কিন্তু সমিতি ইচছা করলে তা বাতিল করতে পারবে। (তৎকালীন)
  • এককালীন একশত টাকা প্রদান করলে মাসিক চাঁদা দিতে হবে না। যিনি অন্তত মাসিক চার আনা চাঁদা দিবেন তিনিই চাঁদাদাতা শ্রেণীভুক্ত হতে পারবেন।
  • মিশনের সেবা বা অন্য কোন নি:স্বার্থ কাজের জন্য যারা নিয়মিতরূপে সময় ব্যয় করতে পারবেন তাঁরা দুজন পুরাতন সভ্য বা দুজন পুরাতন সেবকের সুপারিশ পত্র পেলে এবং স্থায়ী সমিতি অনুমোদন করলে সেবক রূপে গণ্য হতে পারবেন।
  • রামকৃষ্ণ মিশনের কর্তৃপক্ষ স্থানীয় মিশন পরিচালনার জন্য একজন প্রধান তত্ত্বাবধায়িক নিয়োগ এবং স্থানীয় মিশনের সভ্যগত হতে একটি কার্যনির্বাহক সমিতি গঠন করবেন।
  • কর্তৃপক্ষ এই প্রধান তত্ত্বাবধায়ককে বা সমিতির সভ্যগণকে পরিবর্তন করতে পারবেন।
  • স্থানীয় সমিতির সাথে পরামর্শ করে কর্তৃপক্ষ স্থানীয় মিশনের জন্য নিয়মাবলী প্রস্তুত করবেন।
  • উপযুক্ত সময়ে আলোচ্য বিষয়ের সংবাদ নিয়ে সম্পাদক অথবা সহকারী সম্পাদক প্রতি মাসে কার্য নির্বাহক সমিতির সভা আহবান করবেন। প্রত্যেক সভার কার্য বিবরণী বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠাবেন।
  • সম্পাদক অথবা সহকারী সম্পাদক প্রতি অধিবেশনের কার্যবিবরণী সভাপতির দ্বারা দস্তখত করিয়ে রাখবেন এবং মিশন কর্তৃক যে সমস্ত কার্য অনুষ্ঠিত হয় তার বিবরণ ও আয়-ব্যয়ের বিস্তৃত হিসাব সমিতির মাসিক সভায় উপস্থিত করবেন।
  • মিশনের সভ্য ও সর্বসাধারনের নিকট হতে প্রাপ্ত চাঁদা এককালীন অর্থ এবং অন্য কোনরূপ সাহায্য দ্বারা রামকৃষ্ণ মিশনের ব্যায়াদি নির্বাহিত হবে। কিন্তু চাঁদাদি যে কার্যের জন্য সংগৃহীত হবে ঠিক সেই কার্যে ব্যয় হবে।
  • সম্পাদক অথবা সহকারী সম্পাদক অর্থাদি গ্রহণ করে নিয়মিত রশিদ দিবেন।
  • চাঁদাদি আদায়কারীগণ তাঁদের সঙ্গে একখানা আদায়ের পুস্তক রাখবেন। যখন যে অর্থ আদায় হবে, তা ঐ পুস্তকে দাতার স্বহস্তে লিখিয়ে নিবেন। এবং সপ্তাহে অন্তত একবার তাঁদের সংগৃহীত অর্থাদি সম্পাদক অথবা সহকারী সম্পাদকের নিকট জমা দিবেন। সম্পাদক অথবা সহকারী সম্পাদক যখন যে টাকা পান তার রসিদ দাতার নিকট প্রেরণ করবেন।
  • রামকৃষ্ণ মিশনের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রতি বছর নিয়োজিত হিসাব পরীক্ষক দ্বারা প্রতি মাসের হিসাব প্রতি মাসে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

মিশনের বিভাগসমূহ

মানবের আধ্যাত্মিক, মানসিক ও কায়িক ত্রিবিধ অবস্থা হেতু সেবাকাজও তিন প্রকার। রামকৃষ্ণ মিশন মূলত –

(ক) প্রচার বিভাগ

(খ) শিক্ষা বিভাগ

(গ) সেবা বিভাগ

 

প্রচার বিভাগ

  • সাপ্তাহিক ধর্মসভা: মিশনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতি শনিবার সায়াহ্নে মোহিনীবাবুর বাড়িতে এ সভার অধিবেশন হতো। ১৯২০ সনের জুলাই মাসে মোহিনীবাবুর বাড়ি থেকে প্রসন্ন কুমার দাস এর “গৌরীদান” ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ধর্মগ্রন্থ পাঠ, সদালোচনা ও সঙ্গীতাদির দ্বারা সাধারনের মধ্যে ধর্মভাব সঞ্চার করা এর উদ্দেশ্য। ধর্মপিপাসু ব্যক্তিমাত্র এতে যোগদান করতে পারতেন। ঢাকা মঠের পরিচালনায় প্রতি সপ্তাহে ফরাশগঞ্জ শনিবার, তাঁতিবাজার শুক্রবার, কাপ্তান বাজার সোমবার ও নারিন্দায় বুধবার এসব ধর্মীয় অধিবেশন হতো।
  • শাস্ত্রচর্চা: ধর্মের সনাতন তত্ত্ব সকল যাতে বর্তমান জীবনের ধারণা ও অনুষ্ঠানযোগ্য হয় – এ উদ্দেশ্যে মিশনে শাস্ত্র আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে শ্রীমদ্ভগবগীতা আলোচিত হয়েছে। সমস্ত বছরে ৬৪ দিন অধিবেশন হয়েছিল।
  • শিক্ষা বিভাগ: শিক্ষাক্ষেত্রেও মিশনের লক্ষ্য অতিশয় উচ্চ। এদেশের জনসাধারণকে সংসার সংগ্রামে সমর্থ করাই একমাত্র অভিপ্রায় নয় বরং যাতে তারা জাতীয় আদর্শ অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় আধ্যাত্মিক সম্পত্তির উপযুক্ত উত্তরাধিকারী হয়ে বীরের মত জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারে তাই মিশনের উদ্দেশ্য।
  • বিদ্যালয়: ১৯১৪ সনের ৮ নভেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণ অবৈতনিক বিদ্যালয় নামে দরিদ্র বালকদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়। ১৯১৬ সনে ওয়ারী ও মৌশুন্ডির ভাড়া বাড়ি থেকে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। পূর্বে এতে মাত্র ৩টি শ্রেণী ছিল। কিন্তু গত তিন বছরে এক একটি করে উপরের আরও তিনটি শ্রেণী খোলার জন্য ব্যবস্থা হয়। এখানে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ মাস পর্যন্ত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯১৮ সনে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রণালী নতুনভাবে গঠিত হয়েছে। শিক্ষনীয় বিষয়ের একটি ক্রমনিবন্ধ তালিকা প্রস্তুত করে তদনুসারে ছাত্রদের বাংলা ভাষার সাহায্যে ৭ বছরে পাটিগণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, কৃষি ও স্বাস্থ্য সম্বন্ধে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষামান পর্যন্ত জ্ঞানদানের চেষ্টা হচ্ছিল। তখন থেকে বাংলা ভাষা প্রধান ভাষা এবং ইংরেজী গৌণ ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেয়া হয়। ছাত্রদের দৈহিক, নৈতিক ও ধর্মশিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। উপজীবিকা শিক্ষার সূচনা স্বরূপ বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ দরিদ্র ছাত্রদের দপ্তরির কাজে শিক্ষাদানের সংকল্প করেছিলেন। যাতে ছাত্রগণের আত্মসম্মানবোধ ও কর্তব্যবুদ্ধির উন্মেষ হয় এবং তারা মানুষ বলে গৌরব বোধ করতে পারে। এর ফলে যাতে তারা বুদ্ধিপূর্বক ও সৎভাবে নিজ নিজ ব্যবসা পরিচালনা করে ও সুবিধা পেলে অধিক জ্ঞানলাভের পথে অগ্রসর হয়। আপাতত তাই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য। তাছাড়া ছাত্রগণ শিল্প শিক্ষারও সুযোগ পেত নিজেদের পায়ে দাড়ানোর জন্য। ১৯১৪ সনে ওয়ারী ও মৌশুন্ডিতে যে ভাড়া বাড়িতে বিদ্যালয় ছিল তা এ ভূমিতে আসে ১৯১৬ সনে। যেখানে ছাত্রাবাস রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ মুখী লম্বা টালির চালাগৃহে এটি শুরু হয়। পরে বিদ্যালয় বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত করা হয় এক তলা ভবনে। বিদ্যালয়ের ছাত্রদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯৮৫-৮৬ সনে এটি দ্বিতল ভবনে রূপান্তর করা হয় যা বর্তমানে দেখা যায়। এটি একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রায় ৩০০ ছাত্র অধ্যয়ন করে এখানে। ঢাকা বোর্ডের পাঠ্যক্রম এখানে গৃহীত। স্বামী বিবেকানন্দের মানুষ তৈরি ও চরিত্র গঠন শিক্ষা আদর্শকে যথাসম্ভব অনুসরণ করা হয়। বেশ কিছু দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র বিনা খরচে, আবার কিছু ছাত্র আংশিক খরচে পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকে। এখানে জাতীয় দিবস, বার্ষিক উৎসব, পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ে বার্ষিক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ছাত্র, অভিভাবক ও সমাগত দর্শকদের সমাবেশ খুবই আকর্ষণীয়। বিদ্যালয়টিকে উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা অনেকদিনের। অর্থ ও সুযোগের অভাবে এ কাজ রূপান্তরিত করা সম্ভব হয় নি। এ ব্যাপারে জনসাধারণ, সরকারী ও বেসরকারী সাহায্য একান্ত কাম্য।
  • বিদ্যানিকেতন: রামকৃষ্ণ মিশন ঢাকার আদিলগ্নে ছাত্রদের রাখার বন্দোবস্ত ছিল না। পঞ্চাশের দশকে কিছু কিছু ছাত্র থাকতে শুরু হয় বর্তমান গ্যারেজ যেখানে রয়েছে সেখানের একটি লম্বা টালির চালার ঘরে। ষাটের দশকে দ্বিতল অট্টালিকায় বর্তমান বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী ভবনটি নির্মাণ হয়। এখানে ৬২ জন ছাত্র থাকতে পারে। এরপর ২০০৪ এর দিকে ছাত্রদের থাকার অভাব পূরণে হাসপাতাল সংলগ্ন দোতলায় আরেকটি নতুন ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে ৩২ জন ছাত্র থাকতে পারে। দুটি ভবনে বর্তমানে মোট ৮৪ জন উচ্চ মাধ্যমিক পাঠরত ছাত্র রয়েছে। শান্ত ও পবিত্র পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ লাভ করে দেহ-মন-প্রাণের উৎকর্ষ সাধনের সুযোগ পায় বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ও সেবামূলক কাজে এখানকার ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে থাকে। ঢাকার বাইরের থেকে আগত যারা নটরডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির সুযোগ পায় তারাই এখানে থাকার সুযোগ পায়। কারণ অরাজনৈতিক এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সময়সূচী ও নিয়মকানুনের অনেক কিছুর সামঞ্জস্য রয়েছে। প্রতিবছর দরিদ্র ও মেধাবী কয়েকজন ছাত্রকে বিনা খরচে বা আংশিক খরচে এখানে থেকে পড়াশুনার সুযোগ দেয়া হয়। ছাত্ররা এ পরিবেশে থেকে পড়াশুনা করে প্রতিবছরই খুব ভাল ফল লাভ করে। গত ২০০৫ সনে পরীক্ষার্থী ছিল ৩৩ জন এদের মধ্যে এ+ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ২১ জন, এ পেয়েছিল ৬ জন ছাত্র, এ- পেয়েছিল ৬ জন ছাত্র। এখানকার ছাত্ররা প্রতিবছর যে রেজাল্ট করে তারই একটি নমুনা এটি। এ বিদার্থী ভবনের ছাত্রগণ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য সুযোগ লাভ করে অতি সহজেই। তাছাড়া অনেকে ভারতীয় বৃত্তি নিয়েও পড়াশুনার সুযোগ লাভ করে।
  • বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ: ১৮৮৯ সনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত কিছু যুবক ঢাকা মঠের অধ্যক্ষ স্বামী অক্ষরান্দের সান্নিধ্যে এসে বিবেকানন্দের মানবসেবা শিক্ষা এবং সংস্কৃতি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে “বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ গঠন করে। যুবকদের অন্যতম শ্রীরামচন্দ্র সাহা প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রূপে সকলের সহযোগিতায় বেশ কয়েকবছর কাজ করে পরিষদকে বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নের পর থেকে ত্রাণকার্য এবং অন্ধ দরিদ্র ও শিশুদের প্রয়োজনে সেবাকাজ করে যাচ্ছে এ পরিষদের যুবকবৃন্দ। এদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে “স্বামী বিবেকানন্দের” ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হলের উপাসনালয়ে সাপ্তাহিক প্রার্থনা ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ হয়। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মোৎসব ব্যতীত রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয়। অনুষ্ঠানাদিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বক্তাগণ ভাষণ দান করেন। এছাড়া রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীবৃন্দ এবং অন্যান্য বিদগ্ধ বক্তা ও অধ্যাপকমন্ডলী অংশগ্রহণ করেন এসব অনুষ্ঠানে। বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ এর একটি কেন্দ্রীয় কমিটি রয়েছে। সম্পাদক শ্রী অখিল কুমার ভৌমিক। এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা। বর্তমানে বাংলাদেশে বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের ১৬টি শাখা কেন্দ্র রয়েছে। তাছাড়া ইংল্যান্ড ও আমেরিকায়ও এর দুটি শাখা আছে।

 

সাংস্কৃতিক কর্মসূচী

১৯৭৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী বর্তমান সংস্কৃতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মো: সায়েম। ১৯৭৭ সনে এই দ্বিতল অট্টালিকাটির দ্বারোৎঘাটন করেন মাসকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের জেনারেল সেক্রেটারী শ্রীমৎ স্বামী গম্ভীরানন্দ মহারাজ। এই দ্বিতল অট্টালিকাটি “সংস্কৃতি ভবন” নামে পরিচিত। এরপর অফিস ভবন থেকে নীচতলার গ্রন্থাগার। সংস্কৃতি ভবনের “দোতলায় বিবেকানন্দ হল” এখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ অডিটোরিয়াম হলে প্রায় ৫০০ শ্রোতা একই সময়ে বসে অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পায়। অডিটোরিয়ামটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। প্রতিবছর নিয়মিতভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সংস্কৃতি ভবনের হল ঘরে। এসব আলোচনা আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের বাইরেও নির্দিষ্ট স্থানে হয়। অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, দেশ-বিদেশের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতসহ খ্যাতিমান ব্যক্তিগণ এসকল অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় মনীষীদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বরেণ্য শিল্পীরাও এসব অনুষ্ঠানে গান গেয়ে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীগণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজিত ধর্মীয় ও শিক্ষা বিষয়ক আলোচনা চক্রে অংশগ্রহণ করে থাকেন বিভিন্ন সময়ে।

 

গ্রন্থাগার

১৯৭৩ সনে ৩ ফেব্রুয়ারী বর্তমান গ্রন্থাগারটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। এ ভবনটি সংস্কৃতি ভবন নামে পরিচিত। অফিস ভবন থেকে সংস্কৃতি ভবনের নীচতলায় গ্রন্থাগার স্থানান্তর করা হয়। গ্রন্থাগারটি সর্বপ্রকার পাঠকের শান্ত ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পড়াশুনার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র। প্রায় ষাটজন পাঠক একই সময়ে আলাদা আলাদা চেয়ার টেবিলে বসে পড়ার সুযোগ পায়। সাধারণ পাঠকসহ বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রন্থ রয়েছে। এখানে প্রায় ১৫০০০ গ্রন্থ আছে। ৬৪টির উপর পত্রিকা ও সাময়িকী রাখা হয়। বছরে প্রায় ৩৫০০০ পাঠক এ গ্রন্থাগারে পড়াশুনা করে বিনা খরচে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা আছে।

 

প্রশিক্ষণ কর্মসূচী

এক সময়ে ছাত্রাবাসের নীচতলায় এটির অবস্থিত ছিল। তারপর চিকিৎসালয় সংলগ্ন অট্টালিকার নীচতলায় কারিগরী প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মোটরগাড়ি মেরামত, ওয়েল্ডিং এবং অন্যান্য শক্তিচালিত যন্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। প্রশিক্ষণান্তে এরা বিশেষ যোগ্যতা লাভ করে বিভিন্ন কল কারখানায় কাজ করে আয়ের সংস্থান করতে পারতো। এছাড়া নিজেরাও প্রশিক্ষণের পর ব্যবসা পরিচালনা করে সাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেত। ইতিমধ্যে ৩৮ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকের প্রায় সকলে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত রয়েছে। যুগের চাহিদার সাথে কর্মেরও পরিবর্তন হয়। তাই বর্তমান যুগোপযোগী করে যুবকদের জন্য একটি “কম্পিউটার ট্রেনিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” খোলা হয়েছে। ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক কোর্স এখানে রয়েছে। যাতে প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির জন্য সুবিধা হয়। প্রতি ব্যাচে বারজন করে প্রশিক্ষণ নিতে সক্ষম হবে এখানে।

 

সেবা বিভাগ

  • চিকিৎসা সেবা: আশির দশকে চিকিৎসালয়টি প্রথমে দোতলা এর কিছু পরে তিনতলায় রূপান্তর করা হয়। রোগীদের জন্য এখানে এলোপ্যাথি চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। গত বছর ৪০,৫০০ রোগীর চিকিৎসা করা এবং বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।  প্রতিদিন শত শত রোগীকে অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত ডাক্তারগণ চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। নাক, কান ও গলা সহ চোখের চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। প্যাথলজি বিভাগ, দন্ত বিভাগের ব্যবস্থা আছে। একটি উন্নতমানের এক্সরে যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে যাতে রোগীরা অল্পমূল্যে এক্সরে করার সুযোগ পায়। তাছাড়া আলট্রাসনোগ্রাফি বিভাগ এখানে রয়েছে।
  • ১৫ জন চিকিৎসক এখানে সেবা কাজে রত আছেন। বন্যা ও দুর্যোগের সময়ে দুর্গত স্থানে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসে হাসপাতালগুলোতে রক্তের অভাব পরিলক্ষিত হয়্ তাই ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনে এসময় দু:স্থ রোগীদের জীবনরক্ষার্থে রক্তদান কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। তাছাড়া দূর্গাপূজা উপলক্ষ্যেও দুদিন রক্তদানের ব্যবস্থা করা হয়। এতে রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু-ব্রহ্মচারী, ছাত্র, ভক্ত ও অনুরাগী স্বেচ্ছায় রক্তদান করে থাকেন। বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, সন্ধানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এসব কাজে সহযোগিতা করে থাকে। এখানে বর্হি:বিভাগে ডাক্তার দেখানো ও ঔষধ বাবদ  ১৫ টাকা প্রদান করতে হয়। এছাড়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখালে ২০০ টাকা ফি প্রদান করতে হয়। 
 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
গুরুদুয়ারা নানকশাহীঢাকা শহরে অবস্থিত একটি শিখ ধর্মের উপাসনালয়
বায়তুল মোকাররম মসজিদপল্টন, পল্টন
ঢাকেশ্বরী মন্দিরঢাকা, ঢাকেশ্বরী মন্দির
তারা মসজিদঢাকার আরমানিটোলা-র আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত ‘তারা মসজিদ’
সাত গম্বুজ মসজিদমোহাম্মদপুর এলাকার সাত মসজিদ রোডে এই ঐতিহাসিক মসজিদ অবস্থিত
মুসা খান মসজিদমুসা খান মসজিদ হল বারোভুঁইয়াদের বংশধরদের স্থাপিত একটি মসজিদ
শ্রী শ্রী রক্ষা কালীমাতার মন্দিরওয়ারী, টিকাটুলী
শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্ধন্ধু মহা প্রকাশ মঠওয়ারী, টিকাটুলী
শ্রী শ্রী শিব মন্দিরকোতোয়ালী, শাঁখারী বাজার
গুলশান উত্তর জামে মসজিদগুলশান, গুলশান ২
আরও ১০ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি