পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের রিকশাচালক বাবা

জীবনটা বাবা বড় কষ্টের। লেখাপড়া শিখিনি বলে অনেক লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে। মোটা কাপড় আর মোটা ভাতের জন্যে উদয়াস্ত খেটেছি। বর্গাজমি চষেছি। মাছের পোনা চাষ করেছি। কিছুতেই কিছু হলো না। ছেলেরা বড় হচ্ছে। পড়াশোনার খরচ বাড়ছে। বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে রিকশার প্যাডেলে পা রাখলাম। আজ আমি খুশি। আমার দুই ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ছে। এক ছেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। এখন তারা আর আমাকে রিকশা চালাতে নিষেধ করে।’
শনিবার (১৮ জুন) ইফতারের পর এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানালেন মো. জাকের হোসেন (৫৫)। একজন রিকশাচালক হয়েও অদম্য মনোবলের কারণে তার সন্তানেরা আজ উচ্চশিক্ষিত।
 এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা যে কতটা দরকারি আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে করেই হোক আমার সন্তানদের শিক্ষিত করবো। প্রয়োজনে রক্ত বিক্রি করে হলেও তাদের পড়াশোনার খরচ চালাবো। আশার কথা হচ্ছে, আমার সন্তানরা অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। নিজেরা কেউ লজিং থেকে, কেউ টিউশনি করে বাবাকে স্বস্তি দিতে চেয়েছে। এ ধরনের সন্তানের বাবা হয়ে আমি গর্বিত। আমি দেশবাসীর দোয়া চাই। যাতে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।’
জাকের হোসেনের তাড়া আছে। তারাবীহ নামাজ পড়তে যাবেন তিনি। হয়তো দোয়া করবেন, ছেলেদের জন্যে। তাদের উচ্চশিক্ষার জন্যে। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্যে।
জাকের হোসেনের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ফরিদ খুবই মেধাবী মুখ। বন্ধুরা যখন বিকেল বেলা খেলার মাঠে হইহুল্লোড় করে তখন মেডিকেল ছাত্রাবাসে নিজ কক্ষে বইয়ের পাতায় পাতায় ডুব সাঁতারে মশগুল ফরিদ। সময় হলে ছুটে যায় মসজিদে। সপ্তাহে তিন দিন পড়ায় একটি টিউশনিতে। সবাই যখন অ্যানড্রয়েড ফোনে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারে ব্যস্ত তখনও ফরিদের হাতে সাধারণ একটি ফোন। যেখানে সুযোগ নেই বাবার ছবি তোলার। বাবার কথা মনে পড়লে একনজর দেখার। শুধু কথা বলা যায়।
ফরিদদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়ার বাইশ নম্বর গ্রামে। গ্রামের নামটিই অদ্ভুত। ছায়াঘেরা পাখিডাকা চির সবুজ এক গ্রাম। টিনের ছাউনির লাউয়ের ডগা লক লক করা ছোট্ট ঘর। আশপাশে অনেকের সৌরবিদ্যুতের ঝকমকে আলো থাকলেও ফরিদদের ছিল না। কেরোসিনের টিমটিমে আলোতে একআধটু পড়াশোনার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগ পড়ালেখা সেরে ফেলতে হতো দিনের আলোতে। বলা যায় এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
শুধু কি ফরিদ। তার বড় দুই ভাইও সমান মেধাবী। মো. রাসেল উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। মেজ ভাই মো. আজাদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। ছোট দুভাই মো. জাহেদ উদ্দিন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সবার ছোট মো. তুহিন উদ্দিন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
ফরিদ বাড়ির পাশের উত্তর বোয়ালিয়া জাহানারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ভর্তি হয়েছিলেন দুই কিলোমিটার দূরের বোয়ালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে পেয়েছিলেন ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি। সেখান থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। এরপর বাবার অনুরোধে বড় দুই ভাই তাকে নিয়ে আসে চট্টগ্রাম শহরে। ভর্তি করিয়ে দেন মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজে। তখন ভাইদের সঙ্গে কখনো হালিশহর শাপলা আবাসিক এলাকা, কখনো ফইল্যাতলি বাজার আবার কখনো আল ফালাহ গলিতে ব্যাচেলর জীবন কেটেছে তার। সবজি কাটা থেকে শুরু করে ভাত রান্না করে খেতে হতো তাদের। এভাবে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০ মেধাবীর মধ্যে ফরিদ ২২২তম স্থান লাভ করেছিলেন।
বাবার কথা তুলতেই ফরিদের চোখ ছলছল। একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘যখন ছোট ছিলাম বাবাকে দেখতাম মাটি চষে সোনা ফলাচ্ছেন। নিজের জমি, বর্গা জমি ভেদাভেদ নেই। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আবাদ করছেন। আমরা বড় হচ্ছি। পড়াশোনার খরচ বাড়ছে। সংসারের খরচ বাড়ছে। বাবার চোখেমুখে কষ্টের ছাপ। অন্যরা যেখানে ছেলে একটু বড় হলেই কৃষিকাজে লাগিয়ে দিচ্ছিলেন বাবা সেখানে আমাদের জোর করে স্কুলে পাঠাতেন। বলতেন, পড়শোনা করো। মানুষের মতো মানুষ হও। আমি পড়াশোনা না করে যে কষ্ট পেয়েছি তোমাদের বেলায় তা হতে দেবো না।’
‘চাষাবাদে লাভ হচ্ছে না। পুকুরে মাছের পোনা বড় করে বিক্রির ব্যবসা শুরু করলেন। তাতেও সুবিধা করতে পারলেন না। এবার মাটি কাটার কাজ শুরু করলেন। অনেক পরিশ্রমের কাজ। তারপর বলা নেই কওয়া নেই হুট করে চলে গেলেন নোয়াখালীর চাটখিল। রিকশা চালাতে শুরু করলেন। আমরা মাঝেমধ্যে দেখা করতে যেতাম। বছরে এক কি দুবার। তখন বাবার রিকশায় চড়তাম। দেখতাম বাবার শিরা উপশিরাগুলো রিকশা চালানোর সময় ফুলে উঠতো।’ চোখের পানি মুছলেন ফরিদ।
কথায় কথায় মায়ের কথাও এলো। মা আলেয়া বেগম। সংসারের ঘানি টেনে গেছেন সারা জীবন। অল্প টাকায় সংসারটা টেনে নিয়েছেন একাই। দুমুঠো সবজি, শাক আবাদ করতেন। টাকা বাঁচিয়ে ছেলেদের পড়াশোনার খরচ আর বই-খাতার জোগান দিতেন। আমার বড় ভাইও আমাদের জন্যে অনেক করেছেন। নিজে লজিং থেকে পড়েছেন। টিউশনি করে নিজের ও আমাদের পড়াশোনার খরচে ভাগ দিয়েছেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
ফরিদ বললেন, ‘বাবা আমার আদর্শ। বাবার আদর্শ বুকে ধারণ করে, বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই পড়াশোনা করছি। আল্লাহ যদি সুযোগ দেন বাবা’দের জন্যে কিছু করতে চাই। হোক তা বিনামূল্যে চিকিৎসা, কিংবা হাসপাতাল। সে জন্যে দোয়া চাই।’
ফরিদের এ স্বপ্ন, তার বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে যদি ভালোয় ভালোয় এমবিবিএস ডিগ্রিটা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু সে পথ সোজা নয়। যেখানে মেডিকেলের বই-পুস্তক, রেফারেন্স বই, ম্যাটেরিয়ালসের দাম অনেক বেশি। এক সেট বোন’র (হাড়)দামই যেখানে ৩২-৩৩ হাজার টাকা।
শিগগির তৃতীয় বর্ষে উঠবেন ফরিদ। বইয়ের ভার বাড়বে। পড়াশোনার চাপ বাড়বে। খরচও বাড়বে পাল্লা দিয়ে। তিনি কি পারবেন অথৈই সাগর পাড়ি দিতে? পূরণ কি হবে রিকশাচালক হয়েও শিক্ষানুরাগী বাবা জাকের হোসেনের স্বপ্নপূরণ?
 
 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
জাপানি বিজ্ঞানীর জমজমের পানির রহস্য আবিষ্কার করলেন!এখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
অবশেষে ফেঁসে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
টাইটানিকের চেয়ে ২০ গুন বড় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজবিস্তারিত জানুন টাইটানিকের চেয়ে ২০ গুন বড় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ সম্পর্কে
পোষা সিংহ নিয়ে ব্যস্ত সড়কে, আটক করলো পুলিশএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
রোগ সারানোর নামে মারধরের পর গোবর খাওয়ানো হল তরুণীকে এখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
গোমূত্রে তৈরি সাবান, শ্যাম্পু বিক্রি করবে আরএসএসএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
ফিডারের দুধে বিষ মিশিয়ে সন্তানকে হত্যা, মা আটকএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
মাত্র একঘন্টার জন্য ইফতার করেন ফিনল্যান্ডের মুসলমানরাএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
ট্রাম্পের নামে টয়লেট পেপার!এখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
দাড়ি না কাটায় স্বামীর মুখ ঝলসে দিলেন স্ত্রীএখানে বিস্তারিত বর্ননা করা হয়েছে।
আরও ১৩২০ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি