পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণ

১৯১৪ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের বলকানে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যার পরিণামে এক কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় এবং দুই কোটি মানুষ আহত হয়। যুদ্ধের এত বছর পর এখনও এর উৎপত্তির কারণ একটি বিতর্কিত ও বহুল আলোচিত ইস্যু হয়ে রইল।

যুদ্ধ উদ্ভবের দীর্ঘমেয়াদী কারণ বিশ্লেষণ করলে ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে যে কেন পৃথিবীর পরাশক্তি গুলর দুই জোট (একদিকে জার্মানি, অস্ট্রীয়-হাঙ্গেরি জোট অন্যদিকে ফ্রান্স, রাশিয়া, সার্বিয়া, ব্রিটেন) যুদ্ধে জড়াল। এর কারণ হিসেবে রাজনৈতিক, আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামরিক শক্তিবাদ, বিভিন্ন জোট এবং তার বিন্যাসের জটিলতা, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদের উদ্ভব, অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনে সৃষ্ট ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়।

স্বল্পমেয়াদী কারণ বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে জোট দুইটি কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে তাৎক্ষনিকভাবে কখন কিভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হল। তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে ঘটা অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রান্‌জ ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী ডাচেস অফ হোহেনবারগ সোফির হত্যাকাণ্ডকে দায়ী করা হয়।

১৯১৪ সালের জুন মাসে ইউরোপে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রান্‌জ ফার্দিনান্দ নিহত হয়েছিলেন সারায়েভো শহরে। যে ঘটনাপ্রবাহ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা, এই হত্যাকাণ্ড থেকেই তার শুরু । ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন। সারায়েভো শহর সফরে এসেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রান্‌জ ফার্দিনান্দ । লোকজনকে উৎসাহিত করা হয়েছিল রাস্তার দুপাশে সমবেত হতে। সেদিন আকাশ ছিল পরিষ্কার, রৌদ্রোজ্জ্বল একটা দিন। কিন্তু সারায়েভোতে আর্চডিউকের সফরের দিনে সবাই যে খুশি ছিল তা নয়। বসনিয়ার অনেক জাতীয়তাবাদী তরুণই এই ব্যাপারটা নিয়ে ক্ষিপ্ত যে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য তাদের দেশকে দখল করে নিয়েছে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানরা সেখানে ছিল ১৮৭৮ সাল থেকে। এই সময়টুকুর মধ্যে তারা পুরনো ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটায় নি। কৃষকরা তখনো সামন্তবাদী ভূস্বামীদের দাসের মতো। এটা ছিল একটা পুরনো ঔপনিবেশিক শোষণের পরিস্থিতি। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানদের আগ্রহ ছিল একটা জিনিসের প্রতিই। সেটা হল কাঠ। বসনিয়ার উপত্যকাগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঠ পাওয়া যায়। সেই কাঠ তারা নিয়ে যেতো - কিন্তু তার বিনিময়ে স্থানীয় অধিবাসীরা কিছুই পেতো না। এই সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বসনিয়ান তরুণদের একটি অংশ ঠিক করলো, তারা নিজেরাই এর বিরুদ্ধে কিছু একটা করবে। এই গোষ্ঠীর নেতা ছিল ১৯ বছরের এক বসনিয়ান সার্ব। এক গরীব চাষির ছেলে। তার নাম হল গাভরিলো প্রিন্সিপ। সেই রোববারের সকালবেলা সারায়েভোর প্রধান বুলেভার্ড বরাবর যে জনসমাগম হয়েছিল, তাতে হত্যাকারীরা সহজেই জায়গা করে নিলো। এর পর অপেক্ষা - কখন আর্চডিউক তাদের সামনে দিয়ে পার হবেন। রাজকীয় গাড়িবহর তাদের সামনে এলে প্রথমে তাদের একজন গ্রেনেড নিক্ষেপ করলো, তাতে কয়েকজন আহত হলেন। আর ফিরতি পথে আর্চডিউকের ওপর রিভলভার দিয়ে গুলি করলেন গাভরিলো প্রিন্সিপ। একটি গুলি আর্চডিউকের গায়ে লাগলো। অন্যটি গাড়ির দরজা ফুঁড়ে সোফির গায়ে গিয়ে লাগলো। দ্রুতগতিতে খবর ছড়িয়ে গেল, অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক এবং তার স্ত্রী সারায়েভোতে একজন ছাত্রের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য সার্বিয়াকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানায়। সে যুগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছিল গোপনীয়তায় ভরা ও জটিল । ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শত্রুতার কারণে ব্রিটেন প্রথমদিকে জার্মানির প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের সাথে নৌ- প্রযুক্তিতে পাল্লা দিতে শুরু করায় সম্পর্কটি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। ফ্র্যাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পর থেকে জার্মান ও ফরাসিদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ফরাসিরা তাই রাশিয়ার সাথে মৈত্রী করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে দেখত, তাই তারা জার্মানির সাথে মৈত্রী চুক্তি করে। সার্বিয়ার উত্থানের সাথে সাথে স্লাভ জাতীয়তাবাদ জোরদার হয়ে ওঠে। সুযোগ পেয়ে এবার অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে কোণঠাসা করে ফেলে। সার্বিয়ার মিত্র রাশিয়া, সে জোরে সার্বিয়া হুমকি অগ্রাহ্য করবার সাহস দেখায় ও সৈন্য সমাবেশ শুরু করে। বিভিন্ন মৈত্রী চুক্তি, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন পর্যায়ে সত্যের বিভিন্ন বিকৃতি রাষ্ট্রনায়কদের যুদ্ধের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। ২৮ জুলাই ১৯১৪ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরদিন রাশিয়া সৈন্য সমাবেশের মাধ্যমে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে জার্মানিও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এদিকে সার্বিয়ার সমর্থনে ফ্রান্স সৈন্য সমাবেশ শুরু করে। যুবরাজের হত্যার পর, জার্মানির হিসাবে ছিল যে, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত, আঞ্চলিক যুদ্ধে বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। তাই তারা অস্ট্রিয়াকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সার্বিয়ায় হামলা করার অনুমতি দিয়ে দেয়। যা হয় বিরাট ভুল! জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নজিরবিহীন সমর্থন দেয়ায় ভবিষ্যৎ জার্মান শক্তি'র সম্ভাবনায় আতংকিত ফ্রান্স এবং রাশিয়ার তরফ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত শত্রুতা ডেকে আনে! রাশিয়া এবং ফ্রান্স সাথে সাথে যুদ্ধে যোগ দিলেও জার্মানি তাদের ভালই মোকাবেলা করছিল, কিন্তু ব্রিটেনের চোখে রাশিয়া এবং ফ্রান্সের তুলনায় একটি নতুন ও শক্তিশালী জার্মানি ছিল বড় হুমকি তাই তারা পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী ও নিজেদের ক্ষমতার সুরক্ষিত করার জন্যই জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। ব্রিটেনের মত পরাশক্তির আগমন জার্মানির জন্য ব্যাপক হুমকি হয়ে দাড়ায়! আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেই রাশিয়া পরাজিত হয়ে যুদ্ধ-ত্যাগ করে। ব্যাপক সৈন্য ও সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি ও কম্যুনিস্ট প্রোপাগান্ডাই সম্রাটের পতন ও রাশান পরাজয় নিশ্চিত করে! ইতোমধ্যেই ৩ বছর ধরে চলা যুদ্ধে এবং শীতকালে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতির শিকার জার্মান সেনাবাহিনী অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয় আমেরিকান জাহাজে আক্রমণ করে! জার্মান নৌ-বাহিনীর আক্রমণ ঘুমন্ত দৈত্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে ডেকে এনে চূড়ান্ত জার্মান পরাজয় নিশ্চিত করে! ( এমন স্ট্র্যা টেজিক ভুল জার্মানদের দ্বারাই সম্ভব তা আবারো প্রমানিত হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধে ) এছাড়া শিল্পন্নোয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে নব্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা জার্মানীর উত্থান ফ্রান্স, ব্রিটেনের সাম্রাজ্যের জন্য নিশ্চিত হুমকি ছিল এবং এটা ঠেকানোর জন্যই ফ্রান্স-রাশিয়া-ব্রিটেন এবং সবশেষে যুক্তরাষ্ট্র একজোট হয়! এবং ৪ বছর ধরে চলা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি নিশ্চিতের পর হাবসবুর্গ (অস্ট্রিয়ান) অটোমান (তুর্কিশ) এবং রোমানভ (রাশিয়ান) সাম্রাজ্যের মত ৩ টা শতাব্দী প্রাচীন একসময়ের প্রবল আধিপত্য বিস্তারকারী সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিতকারী পরজয় ভাগ্যে জুটে! এবং নিজেদের আড়াল করার নীতি থেকে সরে এসে যুদ্ধের শেষ দিকে যোগ দিয়েই মুল নায়কের আসনে বসে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র!

ঘটনার সূত্রপাত অথবা প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ডকে দায়ী করা হলেও ঐতিহাসিকরা এ যুদ্ধের পেছনে অবদান রাখা আরও কিছু বিষয়াবলীকে দোষী বলে মনে করেন।

ঐতিহাসিকরা কিছু দীর্ঘমেয়াদী কারণ যুক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। যেমন-

•             জোটগুলোর পদ্ধতি ও গঠন।

•             সামরিক ব্যবস্থা।

•             ১৯১৪ সালের পূর্ববর্তী সঙ্কট।

•             বলকান সাম্রাজ্য।

•             আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়াবলী।

 

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি