পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

কিউবা স্বাস্থ্য সেবায় ছাড়িয়েছে উন্নত বিশ্বকেও

দক্ষিণ আমেরিকা এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। দেশটি খুব বেশী বড় নয় কিন্তু বিশ্ব দরবারে দেশটি বেশ পরিচিত। এর অবশ্য উপযুক্ত কারণও আছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই স্বাধীনতা লাভ করেছে ব্রিটিশদের কাছ থেকে। কিন্তু কিউবা স্বাধীনতা(পূর্বে স্পেন) লাভ করেছে বিশ্বের সবচে শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকার কাছ থেকে। আর সেই স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন বিপ্লবীদের রাজপুত্র নামে খ্যাঁত আরনেস্ত-চে-গেভারা।সেই থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে আমেরিকা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল কিউবাকে।কিউবাও তেজের সাথে প্রতিরোধ করে এসেছে।সম্প্রতি সম্পর্কের সামান্য উন্নতি হয়েছে। তবে কোন দিক থেকেই তারা পিছিয়ে নেই। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাদের উন্নতি অভূতপূর্ব।সেখানে রোগী হাসপাতালে  যায় না বরং ডাক্তারই আসেন বাড়িতে।   

 

এক নজরে কিউবাঃ

রাজধানীঃ

হাভানা

সরকারঃ

একদলীয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রb (কমিউনিস্ট রাষ্ট্র)

কাউন্সিল অফ স্টেটের সভাপতিঃ         

ফিদেল কাস্ত্রো

কাউন্সিল অফ স্টেটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতিঃ   

রাউল কাস্ত্রো 

কমিউনিস্ট পার্টির মুখ্য সচিবঃ

ফিদেল কাস্ত্রো

স্বাধীনতাঃ

স্পেন থেকে 

ঘোষিত          অক্টোবর ১০ ১৮৬৮  

প্রজাতন্ত্র ঘোষণা         মে ২০ ১৯০২  

কিউবান বিপ্লব জানুয়ারি ১ ১৯৫৯

জনসংখ্যাঃ

২০০৬ আনুমানিক      ১১,৩৮২,৮২০ (৭৩তম)

২০০২ আদমশুমারি     ১১,১৭৭,৭৪৩

জিডিপি (পিপিপি)    

২০০৬ আনুমানিক

মোট   ৪৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার (২০০৬-এ অনুমিত) (রাংক নেই)

মাথা পিছু       ৩,৯০০ ডলার (রাংক নেই)

মুদ্রাঃ

পেসো(CUP)

রূপান্তরযোগ্য

পেসো d (সিইউসি)

•  ইতিহাস 

কিউবার প্রথম লিপিবদ্ধ ইতিহাস জানা যায় ১৪৯২ সালের অক্টোবর ২৮ তারিখ থেকে। এই দিন দিগ্বিজয়ী নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস তার প্রথম অভিযানে কিউবায় পৌঁছে এই অঞ্চলটিকে স্পেনের অধীন বলে দাবী করেন। কলম্বাস যুবরাজ জুয়ানার নামানুসারে এই দ্বীপটির নাম রেখেছিলেন আইলা জুয়ানা। তখন এই দ্বীপে আমেরিকার আদিবাসীরা বসবাস করতো যাদের নাম ছিল টাইনো এবং সিবোনেই।

•  সরকার এবং রাজনীতি 

কিউবা একটি একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এর শাসনযন্ত্র সম্পূর্ণভাবেই কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির অধীন। ১৯৭৬ সালে প্রণীত সংবিধান বাতিল করে কিউবায় ১৯৯২ সালে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়, যা মার্ক্স, এঙ্গেল্‌স এবং লেনিনের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত। এই নবপ্রণীত সংবিধান অনুসারে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি "রাষ্ট্র এবং সমাজের নেতৃত্বপ্রদানকারী মূল চালিকাশক্তি" হিসেবে অভিহিত হয়েছে।

•  ভূগোল

কিউবা প্রজাতন্ত্র অনেকগুলি দ্বীপের সমষ্টি। এদের মধ্যে প্রধান দ্বীপটি কিউবা দ্বীপ। ইসলা দে লা হুবেন্তুদ ২য় বৃহত্তম দ্বীপ। এছাড়াও আরও অনেক ছোট ছোট দ্বীপ কিউবার অন্তর্ভুক্ত।

 •  অর্থনীতি 

যদিও কিউবা একটি একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এটি মার্ক্স, এঙ্গেল্‌স এবং লেনিনের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত ও অর্থনীতিও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তবুও এটি বর্তমানে বাজার অর্থনীতি এর ধারনা এর দিকে যাচ্ছে। এখন বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজ এবং পশু পালন এর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষিকাজ কিউবাবাসীদের প্রধান উপজীবিকা। আবাদি জমির দুই তৃতীয়াংশে ইক্ষুর চাষ। তামাক, কফি, ক্যাকাও, ফল, শাকসবজি, কর্ন, আলু, চাল প্রভৃতি প্রধান কৃষিপণ্য।

•   জনসংখ্যা 

২০১৪ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী দেশটিতে জনসংখ্যা  ১১,২৩৮,৩১৭ জন। অর্থাৎ প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০২ জন জনসংখ্যা রয়েছে।

কিউবার স্বাস্থ্য সেবা উন্নত বিশ্বের চেয়েও এগিয়ে

ভাবুনতো দেখি, ডাক্তার এসে আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে। সে বাড়িতে এসেই আপনার পুরো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে। শুধু আপনারই নয়, স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে আপনার পরিবারের সবার।

আপনার রক্তচাপ মাপা হচ্ছে, হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে চাকরী এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে। আপনার ঘরবাড়ি, আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কেও সতর্কতার সাথে নোট নিচ্ছেন ডাক্তার। যাচাই বাছাই করে দেখছেন আপনার বা আপনার পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যহানি ঘটে এমন কোনও উপাদান আশপাশে রয়েছে কিনা।

এটা কিউবার স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতির বিবরণ। সার্বিক সফলতা না এলেও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার এই স্ব-উদ্যোগী পন্থাটা বেশ কাজ দিচ্ছে দেশটিতে সেটা বলাই যায়।

কিউবার স্বাস্থ্য সেবা মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতো বটে, বহু ধনী দেশের স্বাস্থ্য সেবাকেও ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্যখাতে মাথাপ্রতি মোটে ৪৩১ মার্কিন ডলার খরচ করে কিউবার শিশুমৃত্যুর হার এখন যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে কম, গড় আয়ু যুক্তরাষ্ট্রের সমান। অথচ যুক্তরাষ্ট্র স্বাস্থ্যখাতে মাথাপ্রতি খরচ করে সাড়ে আট হাজার ডলারের বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, তারা কিভাবে এটা করছে সেটা দেখে অন্য দেশগুলোও শিখতে পারে। ধনী কিংবা গরীব, সব দেশেরই এখান থেকে শেখার আছে।

কিউবায় সরকার বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেয় এবং সবার জন্য এই সেবা সমান। যদিও প্রতিরোধমূলক এই স্বাস্থ্য সেবার মডেলটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে দেশটিতে।

কিউবায় অবশ্য ডাক্তারের কোনও অভাব নেই। এক কোটি দশ লাখ মানুষের জন্য দেশটিতে নব্বই হাজার ডাক্তার। অর্থাৎ প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য আটজন ডাক্তার।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য আড়াই জন ডাক্তার, যুক্তরাজ্যে রয়েছে ২.৭ জন। দেশটিতে এই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মডেলের চাবিকাঠি হচ্ছে বার্ষিক স্বাস্থ্য পর্যালোচনা। অর্থাৎ যে ডাক্তার বা যে ক্লিনিকটির আওতায় যতগুলো পরিবার এখানে চিকিৎসাধীন থাকবে তাদের প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে বার্ষিক ভিত্তিতে।

নাগরিকেরা যদি বার্ষিক পরীক্ষণের যদি ডাক্তারের কাছে বা ক্লিনিকে আসতে না চায় তাহলে তার বাড়িতে যাওয়া হবে, এবং যেখানেই থাকুক তাকে খুঁজে বের করা হবে।

ড. কুইভ্যাস হিল রসিকতা করে বলছিলেন, ‘আমার নার্স জানে তারা কোথায় থাকে। তারা দৌঁড়াতে পারবে, কিন্তু পালাতে পারবে না।’ বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষণের এই তথ্য সন্নিবেশ করে চিকিৎসকেরা নির্ধারণ করেন কোন নাগরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন আর কোন নাগরিক ঝুঁকিমুক্ত।

এখানে উদ্দেশ্য একটাই, রোগ আসার আগেই ঠেকিয়ে দেয়ার চেষ্টা।

সম্প্রতিঃ

আমেরিকা, বিশ্বের অসীম শক্তিধর পরাশক্তি। গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সেই পরাশক্তি সোয়া কোটি মানুষের একরত্তি দ্বীপ, নাম কিউবা, তার গলা টিপে বসে আছে। উদ্দেশ্য সেই দেশটিকে পদানত করা। ১৯৫৯ সালে সেখানে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় হয়, যেকোনো মূল্যে তার পতন। অর্ধশতাব্দী ধরে চেষ্টার পর নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন, কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অঘোষিত যুদ্ধ সুফল বয়ে আনেনি, গত বুধবার হোয়াইট হাউসে দেওয়া ভাষণে ওবামা তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, বছরের পর বছর ধরে কিউবার ব্যাপারে যে নীতি এ দেশ অনুসরণ করেছে, তা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। ‘৫০ বছর ধরে আমরা (অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে) কিউবাকে অন্য সব দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করেছি, কোনো কাজ হয়নি। এখন সময় এসেছে নতুন নীতি অনুসরণের।’
কিউবাকে পিষে মারার জন্য কী করেনি আমেরিকা? ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়ে সামরিক অভিযানের চেষ্টা করেছে। সে দেশের নেতা ও বিপ্লবের প্রতীক ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। মার্কিন সিনেটের এক তদন্তে স্বীকার করা হয়, ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রোকে কমপক্ষে আটবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চের নেতৃত্বে পরিচালিত সেই তদন্তে জানানো হয়, ফিদেলকে হত্যার জন্য ভয়াবহ বটুলিনাম টক্সিন ভরা সিগার তাঁর ব্যবহারের জন্য গোপনে পাঠানো হয়। এমনকি বল পয়েন্ট কলমে হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ লুকিয়ে রেখে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিউবার অর্থনীতি দুর্বল করার লক্ষ্যে অন্তর্ঘাতী তৎপরতা চলেছে ১৯৬০ সাল থেকে। এসব গোপন চেষ্টার পাশাপাশি প্রকাশ্যে কিউবার বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে আমেরিকা। অন্য দেশ যেন কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় না রাখে, সেই চেষ্টাও করেছে সে। ১৯৭৪-এ বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য আমেরিকা যে খাদ্য–সাহায্য পাঠাতে অস্বীকার করে, তার কারণ ছিল নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলাদেশ কিউবায় পাট রপ্তানি করেছিল। কিউবার মানুষকে সে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার জন্য তথাকথিত ‘রেডিও মার্তির’ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চলেছে অহোরাত্রি। ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধের বিরোধিতা করে প্রস্তাব নিয়েছে। এ বছরের অক্টোবরে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিপক্ষে ভোট দেয় শুধু দুটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
আমেরিকার এই অব্যাহত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে কিউবা হয়তো মচকেছে, কিন্তু তার বিপ্লবী চেতনা নুয়ে পড়েনি। ওবামার ঘোষণা তাই এক অর্থে কিউবার বিপ্লবের পক্ষে একটি ভোট।
কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ওবামার জন্য খুব সহজ হয়নি। তাঁর নিজের দল ও প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনো বিস্তর লোক রয়েছে, যারা পুরোনো বৈরিতা জিইয়ে রাখতে চায়। ক্ষুদ্র কিউবা যে নতিস্বীকার করেনি, এদের কারও কারও কাছে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণীয়। বস্তুত, ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের বিজয়ের পর আমেরিকার প্রতিটি সরকার আইসেন হাওয়ার থেকে শুরু করে ক্লিনটন ও বুশ পর্যন্ত সে দেশের প্রতি বৈরী নীতি অব্যাহত রেখেছেন। বারাক ওবামাই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি কিউবার ব্যাপারে ভিন্ন নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত করেন। পাঁচ বছর তিনি ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিতে এবং এ দুই দেশের মধ্যে নাগরিক পর্যায়ে সম্পর্ক বাড়াতে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ কাজে বড় বাধা হয়ে থেকেছে মায়ামিভিত্তিক কট্টর কাস্ত্রোবিরোধী অভিবাসীরা। গত ৫০ বছরে মায়ামির কিউবান অভিবাসীদের গঠন বদলেছে, কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে তাদের সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বে থেকে গেছে কট্টর কাস্ত্রোবিরোধীরা। ওবামার সিদ্ধান্তে তারা যে খুশি হবে না, তাতে সন্দেহ নেই।
নির্বাহী ঘোষণার মাধ্যমে ওবামা অর্ধশতকের মার্কিন নীতি বদলে ফেলেছেন, কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে যে নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় বসবেন, চাইলে সেই সিদ্ধান্ত তিনি বদলে কিউবার সঙ্গে আবারও সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারেন। এ কথাও মনে রাখা দরকার, সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হলেও কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ উঠছে না, সেই ক্ষমতা ওবামার নেই। সেই কাজ করতে পারে একমাত্র মার্কিন কংগ্রেস। আগামী জানুয়ারি থেকে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষই নিয়ন্ত্রণ করবে রক্ষণশীল রিপাবলিকান পার্টি। এই দলে এমন লোকের অভাব নেই, যাঁরা কিউবার কাস্ত্রো ভ্রাতৃদ্বয়কে পরাস্ত করতে হেন কাজ নেই করতে প্রস্তুত নন। এঁদের একজন হলেন ফ্লোরিডা থেকে নির্বাচিত সিনেটর মার্ক রুবিও। তিনি ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, কিউবায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মনোনয়ন কোনোভাবেই অনুমোদিত হবে না। হাভানায় মার্কিন দূতাবাসের জন্য কোনো অর্থ যাতে বরাদ্দ না হয়, তিনি সেই চেষ্টাও করে যাবেন বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন অন্য কিউবান বংশোদ্ভূত টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ। স্পিকার জন বেইনারও ইঙ্গিত করেছেন, তিনি কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিরোধী।
তাঁর ঘোষণায় কী প্রতিক্রিয়া হবে, সে কথা প্রেসিডেন্ট ওবামার অজানা থাকার কথা নয়। তাঁর নিজের দলের ভেতরেই এমন অনেকে আছেন, যাঁরা কিউবার বিরুদ্ধে অব্যাহত অবরোধ জিইয়ে রাখার পক্ষে। ভাবা হয়, হিলারি ক্লিনটন আগামী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন। তাঁর স্বামী বিল ক্লিনটন, সম্ভবত রক্ষণশীলদের কাছে নিজেকে অধিক গ্রহণীয় করার লক্ষ্যে, কিউবার বিরুদ্ধে তাঁর পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের তুলনায় কয়েক গুণ কঠোরতর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। কিউবা একটি ‘সন্ত্রাসী দেশ’—এই যুক্তিতে ক্লিনটন প্রশাসন ১৯৯৯ সালে সে দেশে খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। অন্য সব ‘সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ কড়াকড়ি শিথিল করা হলেও কিউবার বিরুদ্ধে সেই আইন বলবত রাখা হয়। ফলে হিলারি তাঁর দলের মনোনয়ন পেলে স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। হিলারি অবশ্য ইঙ্গিত করেছেন, তিনি অবরোধ জিইয়ে রাখার বিরুদ্ধে। মনোনয়ন পেলে তাঁর সেই মনোভাব টিকে থাকে কি না, তা অবশ্য বলা কঠিন।
এই বিরূপ রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখেও ওবামা যে এমন একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, তার জন্য প্রশংসা না করে উপায় নেই। কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তাঁর আগ্রহ কোনো গোপন কথা নয়। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি সেই উদ্যোগ নেন। সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ ব্যাক টু কিউবা চ্যানেল-এ উইলিয়াম লিওগ্রান্ডে ও পিটার কর্নব্লাহ যে তথ্য দিয়েছেন, সে অনুসারে ২০০৯ সালেই ওবামা স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত মিগেল আঙ্গেল মোরাতিনসের মাধ্যমে কাস্ত্রো প্রশাসনের কাছে এক গোপন বার্তায় কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিউবার কর্তৃপক্ষকে জানাবেন রাতারাতি পরিবর্তন হয়তো আসে না, কিন্তু এখন আমরা এমন একসময়ে বাস করি, যখন পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব। ওবামা সম্ভবত তাঁর নিজের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের কথাই ইঙ্গিত করেছিলেন। সেই বার্তার জবাবে রাউল কাস্ত্রো এ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার জন্য একটি ‘গোপন চ্যানেল’ খোলার পরামর্শ দেন। ঠিক তখনই সেই গোপন চ্যানেল কাজ শুরু করেনি, তবে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৮ মাস ধরে অতিগোপনীয়তায় সেই আলাপ-আলোচনা চলে। এ নিয়ে ওবামা প্রশাসন যে মুখ ফুটে কিছু বলেনি, আলোচনা চালিয়ে যেতে তা সহায়ক হয়। ওবামা যে কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন, সেটিও রাজনৈতিকভাবে তাঁকে সাহায্য করে। গত বছরের নভেম্বরে ওবামা প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন, কিউবায় বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ অবস্থায় আমেরিকার উচিত হবে কিউবার সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন করা। পরের মাস, ১০ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে এসে ওবামা ও রাউল কাস্ত্রো পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন, কানে কানে কিছু কথাও হয়তো বলেছিলেন। রক্ষণশীলদের সমালোচনার মুখে হোয়াইট হাউস থেকে সেই করমর্দনের গুরুত্ব খাটো করে দেখানো হয়েছিল।
অতি রক্ষণশীলদের তারস্বরে প্রতিবাদ সত্ত্বেও কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে সিদ্ধান্ত ওবামা নিয়েছেন, আমেরিকায় তা স্বাগত হয়েছে। এ দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে। ঠিক যেমন অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণের পক্ষে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ। সে কথা জানা সত্ত্বেও রিপাবলিকান আপত্তির মুখে অভিবাসনব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে উদ্যোগ নিতে সাহস পাননি ওবামা। ২০১৪ সাল শেষ হওয়ার আগেও ওবামা এ দুই প্রশ্নেই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ২০১৬ সালে রিপাবলিকান প্রশাসন ক্ষমতায় এলে যে এ দুই সিদ্ধান্তই বদলে যাবে না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। অতি কট্টর রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ও সিনেটর সেই চেষ্টা হয়তো করবেন। নির্বাচিত হতে হলে তাঁদের শুধু নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় সমর্থন প্রয়োজন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দরকার সারা দেশের মানুষের সমর্থন। জনপ্রিয় সমর্থনের মুখে এ দুই সিদ্ধান্ত বদলানোর চেষ্টা যে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে, এটুকু বোঝার ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কট্টর রিপাবলিকানদেরও আছে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি