পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স এর ব্যক্তিগত জীবন

প্রভাবশালী জার্মান সমাজ বিজ্ঞানী ও মার্ক্সবাদের প্রবক্তা। জীবিত অবস্থায় সেভাবে পরিচিত না হলেও মৃত্যুর পর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের কাছে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র মানব সভ্যতা মার্ক্সের তত্ত্ব দ্বারা প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনের পর এ তত্ত্বের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্ক্সবাদ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কার্ল মার্ক্সের জন্মঃ

কার্ল মার্ক্স প্রুশিয়া সম্রাজ্যের নিম্ন রাইন প্রদেশের অন্তর্গত ট্রায়ার নামক স্থানে এক ইহুদি পরিবারে ৫ই মে, ১৮১৮ জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাবা হাইনরিশ মার্ক্স এমন এক বংশের লোক যে বংশের পূর্বপুরুষেরা রাব্বি ছিলেন। আসমানি কিতাব তওরাত সম্পর্কে যার পাণ্ডিত্য রয়েছে তাকে রাব্বি বলা হয়। ইহুদি পরিবারেই হাইনরিশের জন্ম, কিন্তু ধর্মের কারণে আইন অনুশীলনে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তিনি ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে লুথারীয় মতবাদে দীক্ষা নেন। লুথারীয় ধর্ম তখন প্রুশীয় সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম ছিল, তাই সেই রোমান ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে লুথারীয় সংখ্যালঘু হিসেবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা লাভের আশায়ই তিনি এভাবে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। কার্ল মার্ক্সের মা'র নাম হেনরিয়ে-টে নী প্রেসবুরগ (১৭৮৮-১৮৬৩)। তিনি শিল্পপতি গেরারড ফিলিপস ও এন্টন ফিলিপস  এর মাতামহ (আপন নন) এবং বেরেন্ট কোহেন পরিবারের উত্তরসূরি।

শিক্ষা

কার্ল মার্ক্স ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতেই পড়াশোনা করেন। বাল্য-পাঠ শেষে Trier Gymnasium এ ভর্তি হন, ১৭ বছর বয়সে সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অফ বন-এ আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ইচ্ছে ছিল সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে পড়া, কিন্তু তার বাবা মনে করতেন কার্ল স্কলার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তার বাবা তাকে বার্লিনের Humboldt-Universität এ বদলি করিয়ে দেন। সে সময় মার্ক্স জীবন নিয়ে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতেন, তার লেখার ভাষা ছিল বাবার কাছ থেকে পাওয়া ধর্মতাত্ত্বিক তথা অতিবর্তী ঈশ্বরবাদের ভাষা। এ সময়ই তরুণ হেগেলিয়ানদের নাস্তিকতাবাদ গ্রহণ করেন। ১৮৪১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল "The Difference Between the Democritean and Epicurean Philosophy of Nature" (প্রকৃতি সম্বন্ধে গণতান্ত্রিক ও ভোগবাদী দর্শনের মধ্যে পার্থক্য)। উল্লেখ্য, পিএইচডি অভিসন্দর্ভ তিনি বার্লিনের বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা না দিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ জেনা-তে জমা দেন। কারণ তরুণ হেগেলিয়ান র‍্যাডিকেল হওয়ার কারণে বার্লিনে তার ভাবমূর্তি ভাল ছিল না।

পারিবারিক জীবন

মার্ক্স জেনি ফন ভেস্টফালেন-কে বিয়ে করেন। জেনি ছিলেন এক প্রুশীয় ব্যারনের শিক্ষিত কন্যা। তাদের সম্পর্কের বিষয়টি গোপন রাখতে হয়েছিল, কারণ এই বিয়েতে মার্ক্স পরিবারের সম্মতি ছিল না। ১৮৪৩ সালের ১৯শে জুন Bad Kreuznach-এর Kreuznacher Pauluskirche-এ তাদের বিয়ে হয়।

১৮৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে মার্ক্স পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। তখন তারা লন্ডনের সোহো'র ডিন স্ট্রিটে একটি তিন রুমের ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতেন। এরই মধ্যে তাদের চার সন্তানের জন্ম হয়। লন্ডনে বসবাস শুরু করার পর আরও তিন সন্তান হয়। এই সাত জনের মধ্যে কেবল তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বেঁচে ছিল। মার্ক্সের আয়ের উত্স ছিল কেবল এঙ্গেলসের দেয়া ভর্তুকি ও নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন-এর বিদেশী সংবাদদাতা হিসেবে পাওয়া বেতন। জেনি এক কাকা ও মা'র কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্র কিছু অর্থ পায়। এই অর্থই মার্ক্স পরিবারকে কেন্টিশ টাউনের ৯ গ্র্যাফ্টন টেরেস এ অপেক্ষাকৃত ভাল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাসা নিতে সাহায্য করে। আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল না হলেও মার্ক্স তার স্ত্রী ও সন্তানদের বুর্জোয়া সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আবশ্যক সব উপকরণ সরবরাহ করতেন।

জেনির গর্ভে মার্ক্সের যেসব সন্তান হয়েছিল তারা হল: জেনি ক্যারোলিন (১৮৪৪-১৮৮৩), জেনি লরা (১৮৪৫-১৯১১), এডগার (১৯৪৭-১৮৫৫), হেনরি এডওয়ার্ড গাই (১৮৪৯-১৮৫০), জেনি এভেলিন ফ্রান্সেস (১৮৫১-১৮৫২), জেনি জুলিয়া এলিনর (১৮৫৫-১৮৯৮) এবং আরও কয়েকজন যারা নাম রাখার আগেই মারা যায়। বিপুল জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও কার্ল মার্ক্সের মধ্যে মানবিক চাহিদা ছিল না, এমনটা বলা যাবে না।

মৃত্যু

১৮৮১ সালের ডিসেম্বরে জেনি মারা যাওয়ার পর মার্ক্স এক ধরণের catarrh-য় আক্রান্ত হন। এই রোগ তাকে জীবনের শেষ ১৫ মাস অসুস্থ করে রাখে। এই রোগ পরবর্তীতে ব্রঙ্কাইটিস ও সব শেষে pleurisy তে পরিণত হয়। এই pleurisy-র কারণেই ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় মার্ক্সের কোন জাতীয়তা তথা দেশ ছিল না, তাকে ১৭ই মার্চ লন্ডনের হাইগেট সেমিটারি-তে সমাহিত করা হয়। তার সমাধি ফলকে দুটি বাক্য লেখা আছে। প্রথমে লেখা, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন "দুনিয়ার মজদুর এক হও" (Workers of all land unite), এরপরে লেখা ১১তম থিসিস অন ফয়ারবাখ-এর এঙ্গেলীয় সংস্করণের বিখ্যাত উক্তি, "এতোদিন দার্শনিকেরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেছেন, কিন্তু আসল কাজ হল তা পরিবর্তন করা।" (The Philowophers have only interpreted the world in various ways - The point however is to change it)

১৯৫৪ সালে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি কার্ল মার্ক্সের সমাধিতে একটি সৌধ স্থাপন করে যার শীর্ষে আছে মার্ক্সের মুখমণ্ডলের ভাস্কর্য। লরেন্স ব্র্যাডশ এই মুখাবয়বটির স্থপতি। প্রকৃত সমাধিটি সমতল।

মার্ক্সের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে মাত্র ১১ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এ সম্পর্কে এঙ্গেল্‌স লিখেন,

“১৪ই মার্চ বিকেল পৌনে তিনটায় জীবিতদের মাঝে সেরা চিন্তাবিদ তার চিন্তার পরিসমাপ্তি ঘটান। মাত্র দুই মিনিটের জন্য আমরা তাকে রেখে বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে তাকে তার আর্মচেয়ারে বসা অবস্থায় পেলাম, তিনি ততক্ষণে শান্তিতে নিদ্রায় গিয়েছেন- চিরদিনের জন্য        ”

এঙ্গেল্‌স ছাড়া শেষকৃত্যে উপস্থিত অন্যান্যরা হলেন, মেয়ে এলিনর (সমাজবাদী ও বাবার সম্পাদনা সহযোগী), মেয়েদের ফরাসি সমাজবাদী স্বামী Charles Longuet ও Paul Lafargue, Liebknecht (জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা), Longuet (ফরাসি শ্রমজীবী রাজনীতির বিখ্যাত ব্যক্তি); Friedrich Lessner (১৮৫২ সালে Cologne-এ সাম্যবাদীদের বিচারের পর তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন), G. Lochner (কমিউনিস্ট লিগের অন্যতম প্রবীণ সদস্য), Carl Schorlemmer (ম্যান্‌চেস্টারে রসায়নে অধ্যাপক, রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং কমরেড); Ray Lankester, স্যার জন নো এবং লিওনার্ড চার্চ। ফরাসি ও স্পেনীয় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আসা দুটি চিঠি পড়ে শোনানো হয়, এর সাথে এঙ্গেল্‌স বক্তৃতা দেন, এ-ই ছিল শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা। ১৯৭০ সালে সমাধি ডাকাতেরা ঘরে তৈরি বোমার মাধ্যমে তার কবর ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করে।

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি