পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

কলাম্বিয়া স্পেস শাটল বিপর্যয়

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৩ সালে। ১লা ফেব্রুয়ারি ২০০৩, নাসার নভোখেয়াযান বা স্পেস শাটল কলাম্বিয়া ফিরছে পৃথিবীতে। আত্মীয়-স্বজন সবাই জড় হয়েছেন নভোচারীদের স্বাগত জানাতে। কিন্তু এখান থেকেই সে দুঃসংবাদটি পেতে হয় তাদের, নভোখেয়াযানটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পরই বিস্ফোরিত হয়েছে। সাতজন নভোচারীর সবাই মারা গেছেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন একজন ভারতীয় নভোচারী কল্পনা চাওলা, যার আজন্ম সাধ ছিল মহাকাশে যাওয়ার। তিনি নাকি তার বন্ধুদের বলতেন, মহাকাশে গিয়ে যদি তার মৃত্যুও হয় তাতে তার দুঃখ থাকবে না।

 

সাতজন ক্রু ছিলেন এ মিশনে:

  • রিক হাসব্যান্ড, কমান্ডার
  • মাইকেল এন্ডারসন, পেলোড কমান্ডার
  • ডেভিড ব্রাউন, মিশন স্পেশালিষ্ট
  • কল্পনা চাওলা, মিশন স্পেশালিষ্ট
  • লরেল ক্লার্ক, মিশন স্পেশালিষ্ট
  • উইলিয়াম ম্যাককুল, পাইলট
  • আইলান র‌্যামন, পেলোড স্পেশালিষ্ট

 

কল্পনা চাওলা

ভারতে জন্মগ্রহণকারী প্রথম মহিলা নভোচারী হচ্ছেন কল্পনা চাওলা। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কারনালে বসবাস করতেন কল্পনার বাবা-মা। ১৯৬১ সালের ১লা জুলাই সেখানেই জন্ম হয় কল্পনার। মোট দু’টি মহাকাশ অভিযান অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

 

বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়াশোনা শেষে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। মাস্টার্স ডিগ্রি নেন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৮৮ সালে কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর পাওয়ার লিফট কম্পিউটেশনাল ফ্লুয়িড ডাইনামিকস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন নাসায়।

 

নভোচারী হিসেবে মহাকাশে যাওয়ার প্রথম সুযোগটি আসে ১৯৯৭ সালে। কলাম্বিয়া নভোখেয়াযানে চেপে STS-87 মিশনে অংশ নেন। দু’সপ্তাহে ২৫২ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন তারা।

 

স্পেস শাটল

পূর্বে মহাকাশ অভিযানে ব্যবহৃত যানগুলো একবারের বেশি ব্যবহার করা যেত না। অভিযান শেষে একটি ক্যাপসুল এসে পড়ত সমুদ্রে। সেখান থেকেই নভোচারীদের উদ্ধার করা হত। কিন্তু নাসা যে স্পেস শাটল প্রযুক্তি নিয়ে আসে তা বার বার ব্যবহার করা যায়। রকেটের মত ছুঁড়ে দিলেও বিমানের মতই রানওয়েতে নেমে আসতে পারে এগুলো।

 

মহাকাশযানের বিপদ

মহাকাশযানে পেট্রোল, ডিজেলের মত জ্বালানি ব্যবহার করা যায় না। এখানে ব্যবহার করতে হয় তরল হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন। অনেকে বলেন এটা অনেকটা একটা পারমাণবিক বোমার ওপর বসে থাকার মত।

 

আবার এসব জ্বালানি ট্যাংক প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে এর ওপর বরফ জমে যায়। এসব ঝামেলা এড়াতে বিশেষ ধরনের তাপরোধী ফোম ব্যবহার করতে হয়।

 

আবার মহাকাশ যান যখন প্রচণ্ড বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন বায়ুর সাথে সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও চাই হিট শিল্ড।

 

কলাম্বিয়া মিশন

কলাম্বিয়া শাটলের যে মিশনটি বিপর্যয় ডেকে এনেছিল সেটির নাম ছিল STS-107। ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি পৃথিবী থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় কলাম্বিয়া। তাদের এ অভিযানের নাম ছিল, STS-107। মূলত আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নিতেই শাটল কার্যক্রম পরিচালনা করছিল নাসা। তবে STS-107 অভিযানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল কিছু মৌলিক গবেষণা চালানো।

 

সবাই মিলে পালাক্রমে কাজ করে বিরতিহীনভাবে প্রায় ৮০টি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল জীবন সংক্রান্ত বিজ্ঞান, প্রবাহী পদার্থবিজ্ঞান এবং বস্তুবিজ্ঞানের নানা পরীক্ষা।

 

গোলমালটা উৎক্ষেপণের সময় থেকেই

নভোযানটি উৎক্ষেপণের সময়ই হিট-শিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ঘটনাটি ঘটে নভোযান উৎক্ষিপ্ত হওয়ার ৮২ সেকেন্ডের মাথায়। ইনস্যুলেটর ফোম আঘাত করে কলাম্বিয়ার বাম পাশের ডানায়। নভোযানটি মহাকাশে থাকাকালীন ১৬ দিনে এ নিয়ে আরও অনুসন্ধান চালায় নাসা। শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ মহাকাশে থাকা গোয়েন্দা ক্যামেরা ব্যবহার করে আরও ভালো ছবি তোলার মাধ্যমে নাসাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু নাসার কর্মকর্তারা সে অনুরোধ উপেক্ষা করে।

 

বিপর্যয় সকাল ৯টায়

১লা ফেব্রুয়ারি স্বাভাবিকভাবেই কেনেডি স্পেস সেন্টারে অবতরণের উদ্যোগ নেয়  নভোখেয়াযান কলাম্বিয়া। স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কাছাকাছি। এসময় মিশন কন্ট্রোল অস্বাভাবিক তথ্য পেতে শুরু করে। কলাম্বিয়ার বাম পাশের ডানা থেকে তাপমাত্রার রিডিং পাওয়া যাচ্ছিল না। বাম পাশের টায়ার থেকে চাপের রিডিংও পাওয়া যাচ্ছিল না। এসময় কলাম্বিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হয়। ৮:৫৯:৩২ মিনিটে কমান্ডার রিক হাসব্যান্ড কথা বলছেন এমন সময়ই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

এসময় ডালাসের কাছাকাছি ছিল কলাম্বিয়া, শব্দের ১৮ গুণ বেগে চলছিল সেটি। ভূমি থেকে প্রায় ৬১,১৭০ মিটার ওপরে ছিল তখন। আরও কয়েকবার কলাম্বিয়ার সাথে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। অথচ আর ১২ মিনিট পরেই এটির রানওয়েতে অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু ১২ মিনিটের মাথায় মিশন কন্ট্রোলে একটি ফোন আসে, স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল নভোখেয়াযান বা শাটলটির ভেঙে পড়ার ভিডিও সম্প্রচার করছে। দিনের আরও পরের দিকে নাসা বিষয়টি নিশ্চিত করে।

 

পূর্ব টেক্সাসের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের অনুসন্ধান শেষে কলাম্বিয়ার প্রায় ৮৪,০০০ টুকরা বা ভগ্নাংশ উদ্ধার করে নাসা, যা ছিল কলাম্বিয়ার প্রায় ৪০%। এসবের মধ্যে নভোচারীদের দেহাবশেষও ছিল। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

 

২০০৮ সালে এসে নাসা কলাম্বিয়া বিপর্যয়ের বিস্তারিত বিশেষ করে শেষ পাঁচ মিনিটের বিস্তারিত প্রকাশ করে। বলা হয় নভোচারীরা সম্ভবত কলাম্বিয়া ভেঙে পড়ার পরও বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু যখন চাপ কমে গিয়ে তাদের কেবিনটি ভেঙে যায় তখনই তারা মারা যান।

 

এ বিপর্যয়ের পর নাসার নভোখেয়াযান ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়। দু’বছরেরও বেশি সময় নাসার কোন নভোখেয়াযান বা শাটল মহাকাশে যায় নি। মহাকাশ স্টেশনের সাথে যোগাযোগ চালু রাখতে রুশ মহাকাশযানের সাহায্য নেয় নাসা।

 

বিপর্যয়ের কারণ

তদন্ত শেষে বলা হয় সমস্যাটা হিট শিল্ডে। নভোখেয়াযানটি উৎক্ষেপণের সময়ই হিট শিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড উত্তাপ সামলাতে পারে নি কলাম্বিয়া। এ সমস্যাটি নাকি আগে থেকেই জানা ছিল নাসার। কিন্তু কেন নাসা কোন ব্যবস্থা না নিয়ে চুপচাপ বসে ছিল তা নিয়ে গণমাধ্যমে হৈচৈ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসেও এ নিয়ে বিতর্ক হয়।

 

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার আকাশে এটি ভেঙে পড়েছিল। নভোখেয়াযানকে উচ্চ তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ধরনের ফোম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু উৎক্ষেপণের সময়ই এই ফোমের কিছুটা খসে গিয়ে বাম পাশের ডানায় আঘাত করে।

 

এটি যখন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন গরম বাতাস ডানাটির ভাঙা অংশ দিয়ে প্রবেশ করে এর কাঠামোটি নষ্ট করে দেয়। এক পর্যায়ে নভোযানটিই ভেঙে পড়ে।

গ্রন্থনা: শিহাব উদ্দিন আহমেদ

 

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি