পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

এফ আর খান: আকাশচুম্বী ইমারত নির্মাণে টিউব স্ট্রাকচার পদ্ধতির জনক যিনি

এফ আর খানের উদ্ভাবনের আগে যে আকাশচুম্বী ইমারত নির্মাণ করা যেত না তা কিন্তু নয়। কিন্তু সেসব ইমারত নির্মাণে নিচের দিকের ফ্লোরগুলোর দেয়াল আর কলামে যে পুরুত্ব প্রয়োজন হত আর যে পরিমাণ স্টিল প্রয়োজন হত তা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেও লাভজনক ছিল না। ২০-৩০ তলার বেশি উচ্চতার ভবন এ পদ্ধতিতে নির্মাণ কার্যত অসম্ভব ছিল। এ বাধাটি অতিক্রম করতে টিউব স্ট্রাকচার পদ্ধতি নিয়ে আসেন বাংলাদেশী আমেরিকান স্থপতি এফ আর খান। বলা যায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিপ্লব নিয়ে আসেন তিনি। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ব স্থাপত্যবিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন তিনি। তাঁকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইনও বলেন অনেকে।

 

জন্ম এবং বেড়ে ওঠা

এফ আর খানের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায়। ১৯৪৪ সালে আরমানিটোলা স্কুল থেকে থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান। তিনি ছিলেন দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা। যিনি এক সময় জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষও ছিলেন। ম্যাট্রিক পাশ করার পর এফ আর খান ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে।

 

প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা ও বৃত্তি

১৯৫০ সালে কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। তার যখন ফাইনাল পরীক্ষা চলছে তখনই শুরু হয় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসতে বাধ্য হন। ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট)। দু’টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনার ভিত্তিতেই তার পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হয়। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন তিনি।

আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ফুলব্রাইট ফেলোশিপ এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন স্কলারশিপ নিয়ে। এছাড়াও পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেইন থেকে উচ্চ শিক্ষা নেন। মাত্র তিন বছরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তত্ত্বীয় ও ফলিত বলবিদ্যার ওপর দু’টি মাস্টার ডিগ্রি এবং একটি পিএইচডি ডিগ্রি নেন তিনি।

 

কর্মজীবন

তিনি অবশ্য আগেই আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমুর, ওইংস এন্ড মেরীল-এ যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৬১ সালে স্কিডমুর, ওইংস অ্যান্ড মেরীলের পার্টিসিপেট এসোসিয়েট নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে সহযোগী অংশীদার হন এবং ১৯৭০ সালে জেনারেল অংশীদার হন।

 

 

 

 

স্থাপত্যবিদ্যায় রেনেসাঁ

ফজলুর রহমান খানের উদ্ভাবনের মূল দিকটিই ছিল আকাশচুম্বী ভন নির্মাণে টিউব পদ্ধতির ব্যবহার। আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির জয়জয়কার শুরু হয় ষাটের দশক থেকে। অনেকে বলেন এফ আর খান তার অন্যান্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষকে আকাশের অসীমতায় থাকার সুযোগ দিয়েছেন, আকাশের তারা আর পাখির সাথে মিতালী করার সুযোগের পাশাপাশি নগরের মাঝেও নিস্তব্ধতার স্বাদ নেবার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।

 

টিউব স্ট্রাকচারের প্রথম ভবন ডিউ-ইট চেস্টনাট এপার্টমেন্ট নির্মিত হয় শিকাগোয়, ১৯৬৩ সালে।

 

 

 

দুই দশক ধরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবনের খেতাবটি ধরে রেখেছিল এফ আর খানের সিয়ার্স টাওয়ার (মালিকানা বদলের পর বর্তমান নাম উইলিস টাওয়ার)। এখনো এটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন এবং পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম ভবন। ৪৪২ মিটার উঁচু ১১০ তলা এই ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৭৩ সালে।

গগনচুম্বী ইমারত ছাড়াও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনার নকশা করেছিলেন এফ আর খান। এর মধ্যে সৌদি আরবের আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনালের কথা বলা যায়। ১৯৮১ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাঁবুর মত ছাদ, যা প্রয়োজনে ভাঁজ করে রাখা যায়। আরব বেদুইনদের তাঁবু আর আধুনিক কারিগরি দক্ষতার মিশ্রণে তিনি এই বিশাল আচ্ছাদন তৈরি করেন যার নিচে প্রায় আশি হাজার হজযাত্রী বিশ্রাম নিতে পারেন।

 

তার নকশায় নির্মিত অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে আছে আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, কলোরাডো স্প্রিং-এ যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মিনিয়েপোলিসের হিউবার্ট এইচ হামফ্রে মেট্রোডোম।

 

স্ট্রাকচারাল ডিজাইনিং-এ কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন বা ক্যাডের ব্যবহার তিনিই শুরু করেন।

 

এফ আর খান উদ্ভাবিত খণ্ডিত প্রাচীর ফ্রেম পদ্ধতি, ফ্রেম টিউব স্ট্রাকচার এবং টিউব ইন টিউব স্ট্রাকচার পদ্ধতি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিপ্লব নিয়ে আসে।  এ পদ্ধতিতে কলামগুলো ভবনের সীমানার দিকে স্থাপন করা হয়। আর প্রতি তলায় থাকা বীমগুলো কলামগুলোর একটিকে অপরটির সাথে যুক্ত করে। তেতাল্লিশ তলা উঁচু শিকাগোর চেস্টনাট ভবনটি ছিল এ পদ্ধতির প্রথম ভবন।  পরে একের পর এক উঁচু ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ট্রাসড টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম এমনই একটি পদ্ধতি।

 

আরও পরে সিয়ার্স টাওয়ার নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি উদ্ভাবন করেন বান্ডাল টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম। এ পদ্ধতি উদ্ভাবনের আগেই নির্মিত হয়েছিল এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং। সিয়ার্স টাওয়ার কেবল এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর চেয়ে উঁচুই নয় নির্মিতও হয়েছিল বেশি জায়গা জুড়ে। কিন্তু খরচ পড়েছিল কম।

 

২০১০ সালের ৫ জানুয়ারি ডেইলি টেলিগ্রাফ-এ স্টিফেন বেইলি লিখেছেন, ‘খান ভবনকে উঁচু বানানোর নতুন পথ আবিষ্কার করেন। ইস্পাতের কাঠামোর যুক্তিকে তিনি উল্টে দিয়ে বলেন, ভবনের বাইরের দেয়ালটাকে যদি উপযুক্তভাবে মজবুত করা হয়, সে নিজেই একটা কাঠামো হতে পারে…তার এই আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গি গগনচুম্বী ভবন নির্মাণের অর্থনীতি ও গঠন বদলে দেয়। গত বছর ওবামার বিখ্যাত কায়রো বক্তৃতায়ও এফ আর খানের নাম নেওয়া হয়েছে। তাঁর কারণেই বুর্জ খলিফায় সম্ভবত এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের অর্ধেক ইস্পাত লেগেছে এবং এটা সম্ভবপর হয়েছে।’

 

 

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • ১৯৭২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ডস তাকে কনস্ট্রাকশনস ম্যান অব দি ইয়ার মনোনীত করে।
  • ১৯৭২ সালে আরাবানার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলামনাই এওয়ার্ড পান।
  • ১৯৭৩ সালে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি পান।
  • ১৯৮০ সালে লেহাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পান।
  • সৌদি আরবে হজ টার্মিনালের নকশা এবং মুসলিম স্থাপত্যে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনি আগা খান পুরস্কার পান।
  • ১৯৮৩ সালে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস থেকে এ.আই.এ ইনস্টিটিউট সম্মান লাভ করেন।
  • ১৯৯৯ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

 

সিয়ার্স টাওয়ারের নিচের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে কৃতী এই স্থপতির নামে। সেখানে তাঁর একটি ভাস্কর্যও রয়েছে যাতে ধাতুর অক্ষরে লেখা আছে তাঁর বাণী,  ‘একজন প্রযুক্তিবিদের তাঁর আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাঁকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে পারতে হবে। আর জীবন হলো আর্ট, সংগীত, নাটক এবং সর্বোপরি মানুষ।’

 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষ জনমত সৃষ্টি এবং তহবিল সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন এফ আর খান। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ জেদ্দায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর তার দেহ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় নিয়ে সমাহিত করা হয়।

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি