পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

আইফেল টাওয়ারঃ ফ্রান্সের লজ্জা থেকে অহঙ্কারের অলঙ্কার!

আলোর শহরের আলোকের বিচ্ছুরণে চোখে লাগে মনমাতানো আভা, নিশি সুন্দরীর অপরূপ মনোলোভা আলোকচ্ছটায় জীবন্ত আলোকচিত্র হয়ে ভাস্বর হতে থাকে প্যারিসের লাবণ্য।  সহস্র আলোকের বর্ণছটায় যখন সাজে নগরী তখন কি কোন ধাতব কনিকার বিচ্ছুরণ আভা দেয়? যদি বলি দেয়? মেনে নেওয়া হয়তো কষ্টের কিন্তু তাহলে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত আইফেল টাওয়ারকে কি ধাতব কবিতা বলা যায়? না বলে উপায়ই বা কি? অথচ ধাতুর এই খাঁচা তৈরির সময় তার কদরই বোঝেনি ঋষি গেনেভিয়েভ, সম্রাট শার্লিম্যান, ঋষি ডেনিস, পিটার আবেলার্দ, রাজা ফিলিপ অগাস্টাস, সম্রাট প্রথম ফ্রাসোয়া, সম্রাট চতুর্দশ লুই, মহামতি নেপোলিয়ন, জেনারেল চার্লস দ্য গল, আন্দ্রে ল নতর, ব্যারন হাউস্যান, সাম্রাজ্ঞী ক্যাথারিন দ্য মেডিচি ও ম্যারি আন্টনোয়াট, ভিক্টর হুগেল বালজাকের স্মৃতিবিজড়িত  প্যারিস। ভেবেছিল তাদের রূপময়ী প্যারীর সৌন্দর্য ও রসময়তা কেড়ে নেওয়ার এক চক্রান্ত হচ্ছে এই আইফেল টাওয়ার। অথচ কালের বিবর্তনে আজ আইফেল টাওয়ার প্যারিস শহরের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে গোটা বিশ্বে পরিচিত। ১৮৮৭ সালের ২৬ জানুয়ারি আইফেল টাওয়ার চালু হয়েছিল। শহরের মানুষ তখন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, প্যারিসের সৌন্দর্যই এতে নষ্ট হয়ে গেল। বিশিষ্ট জনরা গর্জে উঠেছিলেন, “এ যেন এক দৈত্য শহরের লজ্জা”। এমনকি কমিটি গড়ে রীতিমতো “আইফেল টাওয়ার হটাও” আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনী নাৎসিদের অপব্যবহার রুখতে টাওয়ারের অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলার কথা ভেবেছিল। পরবর্তীতে হিটলার স্বয়ং আইফেল টাওয়ার ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও তার সেই নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল।

ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সে সময় শহরে বসেছিল আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আসর। এই ঘটনাকে বরণীয় ও স্মরণীয় করে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই টাওয়ার। ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯ দুই বছর লেগেছিল টাওয়ারটি তৈরি করতে। এত কষ্ট করে তৈরি করে চট করে আবার তা খুলে না দিয়ে পরিকল্পনা ছিল, মেলা শেষ হওয়ার ২০ বছর পর সেটি আবার খুলে নেয়া হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর কার্যকর হয়নি। কারণ ততদিনে আইফেল টাওয়ারের খ্যাতি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে পর্যটকরা আসতে শুরু করে এই “আয়রন লেডি”কে দেখতে, যা ততদিনে আইফেল টাওয়ারের ডাকনাম হয়ে গেছে। আশেপাশের দোকানে বিক্রি হচ্ছে আইফেল টাওয়ারের ক্ষুদ্র সংস্করণ। কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই টাওয়ার দেখে প্রেরণা পেতে শুরু করেছেন। এই সব কাণ্ড-কারখানা দেখে প্যারিসের মানুষ অবাক। অবাক স্বয়ং গুস্তাভো আইফেল-, যিনি এই টাওয়ারের স্থপতি। উদ্বোধনের দিন ফরাসি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার সময় তিনি ভাবতেই পারেননি যে, তার এই সৃষ্টি অমরত্বের পথে যাচ্ছে।

 

 

মনে রাখতে হবে, সেই যুগে প্রায় ৩০০ মিটার লম্বা এই টাওয়ার ছিল গোটা বিশ্বে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উচু কোনো সৃষ্টি। ১৯৫৭ সালে একটি অ্যান্টেনা বসানোর পর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৩২৪ মিটার। ৭ হাজার ৩০০ টন ইস্পাত দিয়ে তৈরি হয়েছে এই টাওয়ার। আর লোহার খণ্ড ছিল ১৮ হাজার ৩৮টি। ৩০০ জন শ্রমিক এই নির্মাণ যজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী ৪০ বছর ধরে পৃথিবীর উচ্চতম টাওয়ার ছিল এটি, টেলিগ্রাফ এবং রেডিও সঙ্কেত পাঠানোর কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে এই টাওয়ারকে। ১৯২১ সালে ফ্রান্সের প্রথম পাবলিক রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় এই আইফেল টাওয়ার থেকেই। এখন সূর্যাস্তের পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট করে আলোর সাজে সেজে ওঠে “লা তুর দিফেল”। প্রায় ২০ হাজার বাল্বের সেই আলোর ছটা অপরূপ এক দৃশ্য উপহার দেয় প্রতিদিনই। সে আলোয় ছটায় অনেকটা ফিকে হয়ে যায় প্যারিসের অন্যসব স্থাপনা।

 

আইফেল টাওয়ারের ইতিহাসঃ-

আইফেল টাওয়ারটি পৃথিবীর কোন স্থাপনা নির্মাণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনাই বটে। ১৮৮৭ সালে ফ্রান্স সরকার যখন ফরাসী বিপ্লবের স্মৃতি শর্তবাষিকী পালনের তোড়জোড় করছিলেন তখন সেই ঘটনাটিকে স্মরণীয় এক নিদর্শনে ধরে রাখার জন্যই এই প্রতীক মিনারটি তৈরীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন ফরাসীরা। আর এ কাজের জন্য বিখ্যাত সেতু প্রকৌশলী “আলেকজান্ডার গুসটাভ আইফেল”কে (Alexandre Gustave Eiffel) বেছে নেওয়া হয়েছিলো। ইস্পাতের কারিগর প্রকৌশলী আইফেল গর্বভরে বলেছিলেন, শুধু ফ্রান্সের পতাকাই হাজার ফুট উঁচুতে উড়বে! সেই লক্ষ্যে তিনি ইস্পাত দিয়ে একটি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তাঁর স্বপ্ন সত্যি হয় ১৮৮৯ সালে। সেইনের পশ্চিম পারে লাটিন কোয়ার্টার এবং আভালিদের মাঝখানে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর শাজ দ্য মার্স। ষোড়শ লুই এখানে বিপ্লবের আদর্শের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করেন। এখানেই ফরাসি বিপ্লবের প্রথম বার্ষিক স্মৃতি অনুষ্ঠান হয়। এছাড়া প্রতিবছর ব্যাস্টিল দিবস পালিত হয়। এখানে আরো আছে ফ্রান্সের ইকোল মিলিটেয়ার- যেখানে নেপোলিয়ন ছিলেন শিক্ষার্থী ক্যাডেট।

তিনি পেটা লোহার (Worught) খোলা জাফরি (Open lattice) দিয়ে ৩০০ মিটার (৯৮৪ ফুট) উঁচু এই নিখুঁত ও চমৎকার মিনারটি নির্মাণ করেন। তাঁর নামানুসারেই মিনারটির নাম রাখা হয়েছিলো আইফেল টাওয়ার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৮৮৯ সালের ৩১ মার্চে মাত্র দুই বছর, দুই মাস, দুই দিনে টাওয়ারটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিলো। এতো উঁচু আর এমন আকৃতির টাওয়ার বানাতে কিন্তু খুবই কম শ্রম ব্যয় করা হয়েছে। এই টাওয়ারের নির্মাণ কাজটি পূর্তবিদ্যা (Civil Engineering) ও স্থাপত্যশিল্পের (Architecture) ক্ষেত্রে এক বিপ্লবের সূচনা করেছিলো। ইংরেজ যুবরাজ সপ্তম এডওয়ার্ড আইফেল টাওয়ারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১৮৮৯ সালে এই টাওয়ার তৈরিতে খরচ হয়েছিল ৭৮ লাখ ফ্রা। প্রতি দশ বছর পরপর এতে রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়।

দু’একর জমি জুড়ে এর ভিত্তি। টাওয়ারটিতে আছে অর্ধবৃত্তাকার চারটি তোরণ। উঠানামার জন্য আছে লিফ্ট (Elevator)। ৭০০০ টন ওজনের এই স্থাপনাটিতে সিঁড়ি আছে ১৭৯২ টি। টাওয়ারটির চুড়ো থেকে ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এক নজরে দেখে নেওয়া যায়। পর্যটকদের জন্য এটিই হলো আইফেল টাওয়ারের প্রধান আকর্ষণ। ১৯৩০ সালে নিউইয়র্কে “ক্রাইসলার বিল্ডিং”টির (Chrysler Building) নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত আইফেল টাওয়ারই ছিলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থাপনা। কিন্তু, অবাক হলেও সত্য শাজ দ্য মার্সে তাঁদের কর্তৃত্বের অবসান হলে টাওয়ারটিকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  ইতোমধ্যে বেতার প্রযুক্তি আবিস্কৃত হওয়ায় ট্রান্সমিশনের জন্য টাওয়ারটি ব্যবহৃত হতে থাকে এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৯ সালে এর চুড়ায় বসানো হয় একটি বেতার এন্টেনা। এতে তার উচ্চতা আরও ২০.৭৫ মিটার (৬৬ ফুট) বেড়ে যায়। সেই থেকে আইফেল টাওয়ারকে বেতার তরঙ্গ প্রেরণের (Radio Transmision) জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলঃ- পরবর্তী কালে টেলিভিশন প্রচলিত হলে এতে সংযোজিত হয় একটি টি ভি এন্টেনা, যাতে টাওয়ারটির উচ্চতা আরো ৫৬ ফুট বেড়ে যায়।

আইফেল টাওয়ারের টিকেট কাউন্টার পর্যন্ত আসার পথের দু’ধারে মূর্তি। পথের মাঝখানেও মূর্তি। পুরুষের মূর্তি। নারীর মূর্তি। পুরুষ-নারী যৌথ মূর্তি। অনেক মানুষ একত্রে দলগত মূর্তি। বলাবাহুল্য, কোনো মূর্তির গায়েই কোনো কাপড়-চোপড় নেই। টিকেট কাটার পর গেটে রয়েছে মেটাল ডিটেক্টরের হেভি চেকিং, মোটামুটি প্রথম ফ্লোরটি  ২০ তলার মতো উঁচু। বেশ প্রশস্থ। নানারকম দোকান-পাট আছে। ২,০০০ লোক এখানে উঠতে পারে। এবং, দ্বিতীয় ফ্লোরটি  প্রায় ৪০ তলা সমান উঁচু এই ফ্লোরে ১,৬০০ লোক একসঙ্গে উঠতে পারে। টাউয়ারের চূড়ায় কিন্তু মাত্র ৪০০ জন উঠতে পারে এবং আইফেলের চূড়া থেকে সারা প্যারিসকে নানান এঙ্গেলে ৮০ কি.মি বা ৫০ মাইল দূর পর্যন্ত দেখা যায়।

প্রথম প্রথম যখন আইফেল টাওয়ারের নির্মাণকাজ শুরু হয় তখন ফরাসীরা ভেবেছিল তাদের প্যারীর লাস্যময়ীতার হয়তো এইবার সমাপ্তি ঘটতে চলেছে, অথচ কালের ব্যবধানে আজ প্যারিসের সবথেকে বড় সৌন্দর্য ধরা হয় আইফেল টাওয়ারকে। স্বকাল ও ভাবীকালের সৌন্দর্যপিপাসু তৃষ্ণার্ত মানুষের তৃষ্ণা মোচনের আধার হবে থাকবে এই আইফেল টাওয়ার।  

 

আপলোডের তারিখঃ ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ ইং।

 

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
রানী ভিক্টোরিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
রানী ভিক্টোরিয়া (প্রথম পর্ব)ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন যিনি
মারগারেট থ্যাচারঃ ইতিহাসে লৌহমানবী খ্যাত ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীসমাজের নিম্নস্তরের সাধারন ঘরের মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠার বর্ণাঢ্য এক গল্প
মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্টবক্সিং জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
পন্ডিত জহরলাল নেহেরু ও এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের এক অনবদ্য প্রেমকাহিনীদেশ বিভাগের ঐতিহাসিক সময়ের অদ্ভুত এক প্রেম কাহিনী
থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সঃ লরেন্স অব অ্যারাবিয়ালরেন্স অব অ্যারাবিয়াঃ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পেছনের নায়ক
কনকর্ড দি জেট হকবিস্তারিত পড়ুন কনকর্ড দি জেট হক একটি সুপারসনিক বিমানের গল্প
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূত্রপাতের কারণযে বিষয়গুলোর কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
‘নূরজাহান’ মুঘল ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রবিস্তারিত পড়ুন মুঘল ইতিহাসের প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্পর্কে
উইলিয়াম শেকসপিয়ার:ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার ইংরেজি সাহিত্যের জনক
আরও ১৪২ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি