পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

শামসুর রাহমান

স্বাধীনতা তুমি
রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

 

বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি ছিলেন শামসুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর তার লেখা “বন্দী শিবির থেকে” ও “স্বাধীনতা তুমি” এই কবিতা দুটির মাধ্যমে তিনি চিরিদিন বাঙালী হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবেন।

 

জন্ম ও পরিবার:

শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরাতন ঢাকার মাহুতটুলিতে নানীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। সেদিন ছিল বুধবার। সময়টা ছিল সকাল। শামসুর রাহমানের ডাক নাম বাচ্চু। শামসুর রাহমানের পিতার নাম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মাতার নাম আমেনা বেগম। ১০ ভাইবোনের মধ্যে শামসুর রহমান ছিলেন সবার বড়। তবে শামসুর রাহমান ছিলেন তার পিতার ২য় স্ত্রীর সন্তান। তার পিতার ১ম স্ত্রী ৩ সন্তান রেখে মারা যান। এরপর শামসুর রাহমানের পিতা তার ১ম স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করেন। সেদিক থেকে ১৩ ভাইবোনের মধ্যে শামসুর রাহমান ৪র্থ।    

 

শামসুর রাহমানের বেড়ে ওঠা:

শামসুর রাহমান যে পরিবারে বেড়ে উঠেছেন সে পরিবারে সাহিত্য চর্চার ছিটেফোঁটাও ছিল না। তবে পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ কাওয়ালি ও মেরাসিনের গানের সাথে পরিচয় হয়েছিল অতি শৈশবেই। বড় ভাইয়ের স্ত্রীর উর্দু সাহিত্যে পড়াশোনা থাকার সুবাদে তার কাছ থেকে বেশ কিছু উর্দু গল্প ও কবিতা ও মির্জা গালিবের গজল শুনে সাহিত্যের হাতেখড়ি হয় তার। এছাড়া ইয়াকুব আলী নামে তার এক ফুফুর ছেলে থাকতেন তাদের সাথে। ইয়াকুব আলীর রূপকথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তার কাছ থেকে শোনা রূপকথাকেই অবলম্বন করে পরবর্তী সময়ে শামসুর রাহমান পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে নিয়ে প্রতীকী কবিতা “হাতির শুঁড়” লিখেন। শামসুর রাহমানের ছেলেবেলায় ঢাকায় তখনও বিদ্যুৎ ছিল না। মহল্লার মোড়ে ও গলিতে সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত বাতিঅলা। শৈশবে দেখা এই বাতিঅলাকে নিয়েই পরিণত বয়সে কবি লিখেছেন 'শৈশবের বাতিঅলা আমাকে' নামের কবিতাটি। স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ছোট বোন নেহারের মৃত্যুতে একটি কবিতা লেখেন তিনি। তাঁর লেখা জীবনের প্রথম এই কবিতা শুনে তাঁর মা কেঁদেছিলেন খুব।

 

শামসুর রাহমানরা যে এলাকায় থাকতেন সেই মাহুতটুলির আশেক লেনে থাকতেন শিল্পী হামিদুর রাহমানদের পরিবার। একদিন রাস্তা থেকে শামসুর রাহমানকে ডেকে নিয়ে যান হামিদুর রাহমান। শামসুর রাহমানের চেহারা দেখে হামিদুর মনে করেছিলেন, তিনি কবিতা লেখেন। শিল্পী হামিদুর রহমানের বাড়িতে যাওয়া আসার সুবাদে সেইসময়ে ঢাকার প্রথমসারির শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ট পরিচয় ঘটে। হামিদুর রাহমানদের বাড়ির আড্ডার সংস্পর্শেই শামসুর রাহমানের মনে সৃষ্টির বাসনা জেগে ওঠে। হঠাৎ এক মেঘলা দিনের দুপুরে তিনি একটি কবিতা লিখে ফেলেন। সেই কবিতা পড়ে শুনালেন হামিদুর রাহমানকে। তিনি শামসুর রাহমানকে উৎসাহিত করেছিলেন খুব।

 

শিক্ষাজীবন:

শামসুর রাহমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পুরাতন ঢাকার শাখারী বাজার এলাকার পোগোজ স্কুল থেকে। ১৯৩৬ সালে এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। এই স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন শামসুর রাহমান। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই.এ পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিন বছর নিয়মিত ক্লাস করলেও ফাইনাল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করার পর শামসুর রাহমান ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।

 

পারিবারিক জীবন:

১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই আত্মীয়া জোহরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শামসুর রাহমান। এই দম্পতির পাঁচ সন্তান (তিন কন্যা ও দুই পুত্র)। তারা হলেন যথাক্রমে সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজুর রাহমান, ফৌজিয়া রাহমান, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন এবং সেবা রাহমান।

 

পেশাগত জীবন:

পেশাগত জীবনে শামসুর রাহমান ছিলেন একজন সাংবাদিক। ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন অধুনালুপ্ত মর্নিং নিউজ-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন রেডিও পাকিস্তান-এর ঢাকা কেন্দ্রে। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে পত্রিকা জগতে নতুন আসা সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলা পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান -এ (অধুনালুপ্ত 'দৈনিক বাংলা') যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দৈনিক বাংলা এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসময় একটি মোনাজাত নামের কবিতা লেখার জন্য সরকারের রোষানলে পড়েন।

 

সাংবাদিকতার বাইরে তিনি প্রথম সম্পাদনা করেন লিটল ম্যাগাজিন কবিকণ্ঠ । ১৯৫৬ সালে তিনি ছিলেন এটির সম্পাদক মণ্ডলীর সম্পাদক। ১৯৮৭ সালে ক্ষণজীবী অধুনা সাহিত্যপত্রের সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাপ্তাহিক মূলধারায় ১৯৮৯ সালে প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মূলধারার সাহিত্য সহযোগী পত্রের সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নিযুক্ত হন।

 

গ্রন্থসমূহ:

শামসুর রাহমানের গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে কলকাতা থেকে কবীর চৌধুরীর অনুবাদে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমান: সিলেকটেড পোয়েমস । কবিতার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর রচিত শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, গল্প, উপন্যাস, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গদ্য নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বেশকিছু জনপ্রিয় গানের গীতিকারও তিনি।

 

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দি শিবির থেকে (১৯৭২), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪), আমি অনাহারী (১৯৭৬), শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮), হরিণের হাড় (১৯৯৩), তুমিই নিঃশ্বাস, তুমিই হৃদস্পন্দন (১৯৯৬), হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭)। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা ও শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা।

 

শিশুতোষ গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৫), ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো (১৯৭৭), স্মৃতির শহর (১৯৭৯), লাল ফুলকির ছড়া (১৯৯৫)। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: মার্কোমিলিয়ানস (১৯৬৭), রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৮), হৃদয়ে ঋতু, হ্যামলেট, ডেনমার্কের যুবরাজ (১৯৯৫)। সম্পাদিত গ্রন্থ হাসান হাফিজুর রহমানের অপ্রকাশিত কবিতা (বাং ১৩৯২), দুই বাংলার ভালবাসার কবিতা (যৌথভাবে) এবং দুই বাংলার বিরহের কবিতা (যৌথভাবে)।

 

অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শামসুর রাহমানের গল্প, শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অক্টোপাস ।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা:

শামসুর রাহমান অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে: 'আদমজী পুরস্কার' (১৯৬৩), 'বাংলা একাডেমী পুরস্কার' (১৯৬৯), 'একুশে পদক' (১৯৭৭), 'স্বাধীনতা পুরস্কার' (১৯৯১), সাংবাদিকতায় 'জাপানের মিত্সুবিশি পদক' (১৯৯২), ভারতের 'আনন্দ পুরস্কার' (১৯৯৪)। এছাড়া ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করেছে। শামসুর রাহমানকে প্রথম বড় মাপের সংবর্ধনা প্রদান করা হয় ১৯৭৯ সালের ২৪ অক্টোবর। পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শামসুর রাহমান সংবর্ধনা পরিষদ বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করে। কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সম্মানিত হয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া), বার্মা (মায়ানমার), পশ্চিম জার্মানি (সাবেক), যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।

 

জীবনাবসান:

২০০৬ সালের ১৭ আগষ্ট সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি শামসুর রাহমান মৃত্যুবরণ করেন। কবির শেষ ইচ্ছামতো তাকে তার মায়ের কবরে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।  

 

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
হুমায়ুন আহমেদবাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র
কাজী নজরুল ইসলামবাংলার জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি
রাজা রামমোহন রায়ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ
মৃণাল সেনবিখ্যাত বাঙালী চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও লেখক
বেবী মওদুদবিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখিকা
ড. মুহাম্মদ ইউনুসশান্তিতে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরবাংলা সাহিত্যের দিকপাল
নেলসন ম্যান্ডেলাদক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী অবিসংবাদিত নেতা
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াজন্ম: ১৬ ফেব্রু. ১৯৪২ মৃত্যু: ৯ মে, ২০০৯
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার১৯১১ সালের ৫ই মে জন্মগ্রহণ করেন
আরও ৩০ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি