পূর্ববর্তী লেখা    পরবর্তী লেখা
পুরো লিস্ট দেখুন

কাজী নজরুল ইসলাম

এই মানুষটি সম্পর্কে কোনো ভূমিকা লেখার নেই। তাই তার একটি বিখ্যাত কবিতার অংশবিশেষ দিয়ে শুরু করলাম।

বল বীর –

বল উন্নত মম শীর!

শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

বল বীর –

 

জন্ম ও পরিবার:

২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা: ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম: কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। তার মা ছিলেন তার পিতার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং কাজী নজরুল ছিলেন তাদের ষষ্ঠ সন্তান। কাজী নজরুল ইসলামের পিতা পেশায় ছিলেন একজন ইমাম। কাজী নজরুল ইসলামের বয়স যখন নয় বছর তখন তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিলো “দুখু মিয়া”।

 

পড়াশোনা ও প্রাথমিক কর্মজীবন:

কাজী নজরুল ইসলাম স্থানীয় মক্তবে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। তবে তা খুব বেশিদুর পরযন্ত এগোয়নি। তার বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর সংসারে আর্থিক অনটনের কারণে কাজী নজরুল ইসলামকে মাত্র ১০ বছর বয়সে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কর্মজীবন শুরু করতে হয়। প্রথমে স্থানীয় মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পাশ করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি হাজী পালোয়ান এর কবর সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে কাজী নজরুল ইসলাম রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং মাথরুন উচ্চ ইংরেজী স্কুলে পড়াশোনা করেন। মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে।

 

ধীরে ধীরে নজরুল হয়ে ওঠা:

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কোনো না কোনো প্রতিভা থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা শৈশবেই প্রকাশিত হয় আবার কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে লুপ্ত প্রতিভা তার শৈশব কাল থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে। বাল্য বয়সেই তার মধ্যে লোকশিল্পের আকর্ষণ চলে আসে। তাই কর্মজীবন থেকে বেরিয়ে এসে যোগ দেন “লেটো দলে”। সেসময় “লেটো দল” বলতে বুঝাতো বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল। এই দলের বিভিন্ন আসরে কাজী নজরুল নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। “লেটো দলের” নাটকের জন্য গান, কবিতা লিখতে লিখতেই ধীরে ধীরে তার মধ্যে সাহিত্য চর্চার ভাবটি ফুটে উঠতে শুরু করে। ১৯১০ সালে কাজী নজরুল   “লেটো দল” ছেড়ে কাজী নজরুল আবার পড়াশোনা শুরু করেন।  

 

ব্যক্তিগত জীবন:

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন ব্যক্তিত্ব সচেতন ব্যক্তি। তাই তো বিয়ের আসরে আখত সম্পন্ন হওয়ার পর কাবিননামার সময় তাকে “ঘরজামাই” থাকতে বলায় বাসর সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে রেখে কুমিল্লায় বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে আসেন। এর আগে ১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের পরিচয় হয়। তার সাথেই কাজী নজরুল কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। সেখানে প্রমীলা দেবী নামে একজনের সাথে কাজী নজরুলের পরিচয় হয়। উল্লেখ্য যেই আলী আকবরের সাথে কাজী নজরুল কুমিল্লা আসেন সেই আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথেই কাজী নজরুলের আখত সম্পন্ন হয়েছিল। কাজী নজরুল যখন কুমিল্লা আসেন তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। প্রমীলা দেবীর পরিচর্যায় কাজী নজরুল ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন।

 

সৈনিক নজরুল:

জীবনের প্রায় আড়াই বছর কাজী নজরুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণী প্রি-টেস্ট পরীক্ষার সময় লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলয়ামে এবং পরে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে কাজী নজরুল করাচি সেনানিবাসে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরবর্তীতে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সৈনিক জীবন ছেড়ে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতায় ফিরে আসেন।   

 

বিদ্রোহী নজরুল:

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা অন্য যে নামটিতে সবচেয়ে বেশি চিনি এবং জানি সেটি হলো “বিদ্রোহী কবি”। কেননা তার রচিত অনেক কবিতা ও গানের কথায় অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভাবটি ফুটে উঠেছে। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসের ২১ তারিখ সমগ্র ভারত জুড়ে হরতাল ছিল। সেদিন কাজী নজরুল ইসলাম অসহযোগ মিছিলে গান গেয়ে অনুপ্রেরণা যোগান। তার এ ধরনের প্রতিটি কবিতা ও গান আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উন্মাদনা, অধিকার আদায়ের তীব্রতা জাগিয়ে তুলতো। পরবর্তীতে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতাটি প্রকাশিত হলে সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে বিশেষ খ্যাতিলাভ করেন এবং “বিদ্রোহী” কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

 

অসুস্থতা:

নজরুলকে যারা গভীর ভাবে দেখেছেন তারা সবাই স্বীকার করেছেন, মৃত্যু অবধি কাজী নজরুলের দু চোখে যে অপূর্ব দীপ্তি ও তেজোদ্দীপ্ত চাহনী ছিল, তাতে সরাসরি কেউ তার চোখের দিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারতো না। পুরো যৌবন ও তারুণ্যে কখনো তিনি কোন অসুখে পড়েন নি। অবশেষে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাকশক্তি হারান। পরবর্তীতে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করা হলেও তেমন কোনো উন্নতি হয় নি। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে কাজী নজরুল ইসলাম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা করা হলেও তার অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয় নি। অসুস্থতাকে সঙ্গী করে বাকিটা জীবন তিনি বেঁচে থাকেন।

 

বাংলাদেশে আগমন ও মৃত্যুবরণ:

১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। সেসময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার উদ্যোগেই কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এরপর কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের বাকিটা সময় বাংলাদেশেই থেকে যান। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। একই বছর কাজী নজরুল ইসলামের স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হতে থাকে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন নামের আগে অসংখ্য বিশেষণের কাজী নজরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

 

সম্মাননা:

  • ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক এবং ভারত সরকার ১৯৬০ সালে তাকে পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করেন।
  • ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হতে এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ‘ডি-লিট’ পদকে ভূষিত করা হয়।
  • ২০০৪ সালের বিবিসির বাংলা বিভাগ কর্তৃক জরিপকৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ৩য়।
  • বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তি
  • তার রচিত ‘চল চল চল, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ বাংলাদেশের রণ সংগীত হিসেবে গৃহীত
  • অমর একুশে পদক প্রাপ্তি
  • জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
  • ভারত ও বাংলাদেশে পৃথক পৃথক ভাবে নজরুল একাডেমি স্থাপন
  • নজরুল ইন্সটিটিউট নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন
  • ভারতের নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রধান সড়কের নামকরণ ‘নজরুল সরণি’ ঢাকার অন্যতম একটি সড়কের নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ’ রাখা হয়।

 

 
আরো পড়ুন
 

নামসংক্ষিপ্ত বিবরণ
হুমায়ুন আহমেদবাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র
কাজী নজরুল ইসলামবাংলার জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি
রাজা রামমোহন রায়ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ
মৃণাল সেনবিখ্যাত বাঙালী চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও লেখক
বেবী মওদুদবিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখিকা
ড. মুহাম্মদ ইউনুসশান্তিতে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরবাংলা সাহিত্যের দিকপাল
নেলসন ম্যান্ডেলাদক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী অবিসংবাদিত নেতা
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াজন্ম: ১৬ ফেব্রু. ১৯৪২ মৃত্যু: ৯ মে, ২০০৯
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার১৯১১ সালের ৫ই মে জন্মগ্রহণ করেন
আরও ৩০ টি লেখা দেখতে ক্লিক করুন
২৫ বছরে ১৮ সন্তানের জননী!
সর্বপ্রথম পোর্টেবল দ্বীপ
বিদেশিনীর বাংলা প্রেম
জুতার গাছ!
exam
নির্বাচিত প্রতিবেদন
exam
সুমাইয়া শিমু
পিয়া বিপাশা
প্রিয়াংকা অগ্নিলা ইকবাল
রোবেনা রেজা জুঁই
বাংলা ফন্ট না দেখা গেলে মোবাইলে দেখতে চাইলে
how-to-lose-your-belly-fat
guide-to-lose-weight
hair-loss-and-treatment
how-to-flatten-stomach
fat-burning-foods-and-workouts
fat-burning-foods-and-workouts
 
সেলিব্রেটি